বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট (এআই) পণ্যের বাণিজ্য দ্রুত বাড়ছে। এর কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর শুল্কসহ অন্যান্য নেতিবাচক প্রভাব, সংকট অনেকটাই আড়ালে পড়ে যাচ্ছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-আইওয়েলা। জেনেভায় ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এআই খাতে বিনিয়োগের গতি কমে গেলে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রকৃত দুর্বলতা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।’
ডব্লিউটিওর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্য বাণিজ্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ৪২ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর, রাসায়নিক পণ্যসহ শিল্প সরঞ্জাম। এসব পণ্য এআই অবকাঠামো ও ডেটা সেন্টার তৈরিতে ব্যবহার হয়। বিপরীতে এআই-বহির্ভূত পণ্যের বাণিজ্য বেড়েছে মাত্র ৭ শতাংশ।
সাক্ষাৎকারে ওকোনজো-আইওয়েলা বলেন, ‘এআই-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যের দ্রুত প্রবৃদ্ধি বিশ্ব বাণিজ্যের ওপর শুল্ক ও অন্যান্য সংকটের প্রভাবকে আড়াল করছে।’ এআই খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের কারণে যদি কোনো ধরনের ‘বুদবুদ’ তৈরি হয়ে থাকে এবং পরে তা ফেটে যায়, তাহলে বর্তমান বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
বিশ্ব বাণিজ্য এরই মধ্যে নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি, বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে এআই খাত বিশ্ব অর্থনীতিতে বিনিয়োগের বড় একটি উৎস হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা গত মাসে বলেছিলেন, এআই খাতে বিনিয়োগের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে তৈরি জ্বালানি সংকটের ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতি আশঙ্কার তুলনায় ভালোভাবে সামলাতে পারছে।
এর পরও পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ ও মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ বাড়ে।
এদিকে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআই অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। ব্যাংক অব আমেরিকা গ্লোবাল রিসার্চের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআই খাতের উন্নয়ন ও অবকাঠামো তৈরিতে প্রায় ৮০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে পারে।
অন্যদিকে এআই খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ নিয়ে সতর্কতাও বাড়ছে। অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান—দুজনই এআই উন্নয়নের গতি কিছুটা কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। বিশেষ করে এআইয়ের নিরাপত্তা ও এর বিস্তৃত প্রভাব নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
এআই খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে এর প্রভাব শুধু প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কারণ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সেমিকন্ডাক্টর, রাসায়নিক পণ্য, শিল্প সরঞ্জাম ও তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের বড় সরবরাহ ব্যবস্থা।
গত বছরও বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিতে এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্যের বড় ভূমিকা ছিল। ২০২৫ সালে বিশ্ব পণ্য বাণিজ্য ২ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়বে বলে শুরুতে পূর্বাভাস দিয়েছিল ডব্লিউটিও। শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি হয় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। সংস্থাটির অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এআই অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত পণ্যের বাণিজ্য প্রত্যাশার চেয়ে বেশি বাড়ায় এ পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকেও এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাণিজ্য শক্তিশালী ছিল। এ সময়ে বিশ্বের মোট পণ্য বাণিজ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ ছিল এআই-সংক্রান্ত বিভিন্ন পণ্য। তবে এর সুফল সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
ওকোনজো-আইওয়েলা বলেন, ‘২০২৫ সালে এআই-সংশ্লিষ্ট পণ্যের বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৬০ শতাংশের বেশি ছিল এশিয়ার দখলে। অন্যদিকে একই সময়ে বিশ্বের মোট ঝুঁকি মূলধন বিনিয়োগের ৭৬ শতাংশ পেয়েছে উত্তর আমেরিকা। অর্থাৎ এআইয়ের বিস্তারের সুবিধা উৎপাদন ও বিনিয়োগ সক্ষম দেশগুলোর মধ্যে বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।’
ডব্লিউটিও মনে করে, এআই এমন একটি খাত, যেখানে দেশগুলোর মধ্যে আরো বেশি সহযোগিতা প্রয়োজন। বিভিন্ন দেশ নিজেদের মতো করে এআই নিয়ন্ত্রণের নিয়ম তৈরি করছে। এতে ভবিষ্যতে বিভিন্ন বাজারে ভিন্ন নিয়ম চালু হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এদিকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার নেতৃত্ব দেয়া ডব্লিউটিও নিজেও নানা চাপে রয়েছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও চীনের বড় উৎপাদন সক্ষমতার কারণে বিশ্ব বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা আরো বেড়েছে। এসব কারণে ডব্লিউটিওর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ওকোনজো-আইওয়েলা সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না হলে এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। ডব্লিউটিওর বার্ষিক বিশ্ব বাণিজ্য প্রতিবেদনের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাণিজ্য ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উৎপাদন ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
ডব্লিউটিও সংস্কারের উদ্যোগ অবশ্য মার্চে বড় ধাক্কা খেয়েছিল। সংস্থাটির দ্বিবার্ষিক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রীরা সংস্কারের বিষয়ে একটি রোডম্যাপ নিয়ে একমত হতে পারেননি। তবে ওকোনজো-আইওয়েলা বলেছেন, ‘সংস্কার আলোচনা থেমে নেই। জেনেভায় আবার আলোচনা শুরু হয়েছে।’
তার মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো ডব্লিউটিওর সদস্য দেশগুলো বুঝতে পারছে, সংস্কার প্রয়োজন এবং বর্তমান ব্যবস্থাকে আগের মতো রেখে দেয়া আর সম্ভব নয়।