দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের তথ্যপ্রাপ্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রথমবারের মতো আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর বিনিয়োগ সেবা। ফলে তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণভিত্তিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতা বাড়বে। এ সেবা চালু করতে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউজ লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ পিএলসি ও মার্কোপোলো এআইয়ের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে এন্ড-টু-এন্ড ইনভেস্টমেন্ট জার্নি পাওয়ার্ড বাই এআই শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ চুক্তি হয়।
স্বাগত বক্তব্যে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার সাফ্ফাত রেজা বলেন, ‘১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৩০ বছর ধরে লংকাবাংলা পুঁজিবাজারে উদ্ভাবন ও বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। ২০১৩ সালে দেশে প্রথমবারের মতো আর্থিক তথ্যভিত্তিক পোর্টাল চালু করা হয়। বিনিয়োগকারীরা এখন আরো সংক্ষিপ্ত, নির্ভুল ও কার্যকর তথ্য চান, তাই দুই দশকের তথ্যভাণ্ডারকে এআইয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। এটি নতুন প্রজন্ম ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর কৌশলগত পদক্ষেপ।’
মার্কোপোলো এআইয়ের স্ট্র্যাটেজিক গ্রোথ অফিসার ফাহমিদুল হাসান জানান, বিশ্বের বিভিন্ন খাতে মার্কোপোলোর ১ হাজার ৪০০টির বেশি প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহক আছে। সান ফ্রান্সিসকোতে প্রধান কার্যালয়ের পাশাপাশি রিয়াদ, বাংলাদেশ ও ভারতে তাদের কার্যালয় রয়েছে। এ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগকারীরা অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের গতিপ্রকৃতি এবং শেয়ারের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে পারবেন, নিজের আগ্রহ অনুযায়ী শেয়ারের তথ্য পাবেন এবং সার্বক্ষণিক সহায়তার জন্য ভয়েস ও চ্যাটভিত্তিক সেবাও থাকবে।
মার্কোপোলো এআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাসফিয়া তাসবিন বলেন, ‘গত কয়েক মাস নিরলস কাজ করে উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। মানসম্পন্ন ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডারকে গুরুত্ব দেয়ায় ফলাফল আশাব্যঞ্জক। এটি শুধু নতুন পণ্যের উদ্বোধন নয়, পুঁজিবাজারে নতুন সেবাক্ষেত্রের সূচনা।’
লংকাবাংলার প্রায় তিন দশকের অভিজ্ঞতা ও তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মার্কোপোলোর এআই প্রযুক্তি যুক্ত হচ্ছে উল্লেখ করে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যান মাহবুবুল আনাম বলেন, ‘এতে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত ও সহজে বাজার বিশ্লেষণ, বিনিয়োগের সুযোগ শনাক্তকরণ এবং পোর্টফোলিও গঠন করতে পারবেন। লংকাবাংলার মোট লেনদেনের প্রায় ৬০ শতাংশ এখন পোর্টালের মাধ্যমে হয়। জেনারেশন জেড ও প্রযুক্তিবান্ধব তরুণদের সম্পৃক্ত করা তাদের অন্যতম কৌশলগত অগ্রাধিকার।’
প্রযুক্তি ব্যবহারে লংকাবাংলা সবসময় এগিয়ে থাকে উল্লেখ করে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজার পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ প্রযুক্তি গ্রহণে ধীরগতি ও সুশাসনের ঘাটতি। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রাথমিক তথ্য পাওয়া এখনো অনেকটা দুঃস্বপ্নের মতো। কোম্পানির মৌলিক তথ্য সহজে পাওয়া গেলে বিনিয়োগকারী, গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মীরা নিজেরাই বিশ্লেষণ করতে পারতেন।’
ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, ‘বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে এবং পুঁজিবাজার নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের জন্য প্রস্তুত। অর্থনীতি ভালো থাকলে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে এবং বাজারের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ না থাকলে ইতিবাচক গতি ফিরবে।’
চুক্তিটিকে পুঁজিবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, ‘একটি প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিতে এগোলে পুরো বাজার উপকৃত হয়, তাই এমন উদ্যোগে সবার সমর্থন থাকা উচিত। তরুণদের সম্পৃক্ত করতে বাজার পিছিয়ে আছে, এখনই যুক্ত করা না গেলে ভবিষ্যতেও একই সমস্যা থাকবে।’
প্রধান অতিথি বিএসইসির কমিশনার নাফিজ আল তারিক বলেন, ‘জেনারেশন আলফা ও জেনজি সব সেবা হাতের নাগালে চায়। বিএসইসি আর্থিক পরামর্শক বিধিমালা প্রণয়নে কাজ করছে, যেখানে মূলত ব্যক্তির মাধ্যমে পরামর্শ সেবাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে; তবে রোবো-অ্যাডভাইজরি সেবাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবায় পরামর্শকরা সাধারণত বড় গ্রাহকদের দিকেই বেশি আগ্রহী থাকেন, ফলে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা বাইরে থেকে যান। ডিজিটাল প্লাটফর্ম ও এআই ব্যবহার করে গ্রামাঞ্চলের বিনিয়োগকারীরাও পরামর্শ পেতে পারেন।’ আগামী ৫-১০ বছরে মানুষ মোবাইল ফোনেই আর্থিক পরামর্শ নিয়ে সহজে বিনিয়োগ করতে পারবে বলে তিনি আশা করেন।
ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘এ আয়োজন একটি কৌশলগত অংশীদারত্বের প্রতিফলন। বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য সহজলভ্য করা, সিদ্ধান্তকে আরো তথ্যনির্ভর করা এবং বিনিয়োগকারীদের অভিজ্ঞতাকে আরো কার্যকর করা উভয় প্রতিষ্ঠানের অভিন্ন লক্ষ্য। দায়িত্বশীলভাবে এআই ব্যবহার সব অংশীজনের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।’