বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে মিশ্র প্রবণতা

এআই খাতে চাঙ্গা ভাব থাকলেও কাটেনি ইরান যুদ্ধের উদ্বেগ

ইউরোপের বাজারে গতকাল প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত ফ্রান্সের সিএসি ৪০ সূচক ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ৭ হাজার ৮২২ দশমিক ৪৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়।

এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘিরে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ থাকলেও ইরান যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এতে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে ইউরোপের প্রধান বাজারগুলোয় সূচকের পতন হয়েছে। অন্যদিকে ঊর্ধ্বমুখী ছিল জাপানের শেয়ারবাজার এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে চিপ ও এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ। খবর এপি।

ইউরোপের বাজারে গতকাল প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত ফ্রান্সের সিএসি ৪০ সূচক ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ৭ হাজার ৮২২ দশমিক ৪৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়। জার্মানির ড্যাক্স সূচক কমেছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ। সূচকটি নেমে আসে ২৪ হাজার ৮৫১ দশমিক ৯৪ পয়েন্টে। যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচকও ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ১০ হাজার ৪১৩ দশমিক ৮৬ পয়েন্টে নেমেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও কিছুটা দুর্বল অবস্থার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ডাও জোন্সের ফিউচার সূচক দশমিক ৪ শতাংশ কম ছিল। তবে এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর ফিউচার সামান্য বেড়েছে। নাসডাকের প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল। এর আগে গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক দশমিক ৩ শতাংশ কমলেও নাসডাক দশমিক ২ শতাংশ বাড়ে।

এশিয়ার বাজার চিত্র ছিল মিশ্র। জাপানের প্রধান সূচক নিক্কেই ২২৫ বেড়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। দিন শেষে সূচকটি ৬৮ হাজার ৯৫৬ দশমিক ৭২ পয়েন্টে দাঁড়ায়। দক্ষিণ কোরিয়ার কমপি সূচকও ২ শতাংশ বেড়েছে। তবে অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স ২০০ সূচক কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। এদিকে জাতীয় ছুটির কারণে হংকং ও সাংহাইয়ের শেয়ারবাজার বন্ধ ছিল।

টোকিওর বাজারে চিপ ও এআই কোম্পানির শেয়ারের চাহিদা ছিল বেশি। কম্পিউটার চিপের শক্তিশালী চাহিদা ও এআই খাতের প্রবৃদ্ধি থেকে লাভবান হতে পারে, এমন কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখিয়েছেন। এর মধ্যে অ্যাডভানটেস্ট, টোকিও ইলেকট্রন ও সফটব্যাংক গ্রুপের শেয়ারদর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

শেয়ারবাজারের পাশাপাশি নজর ছিল জ্বালানি তেলের বাজারেও। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯২ দশমিক ২৮ ডলারে ওঠে। আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্টের দামও ২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ বেড়ে ১০০ দশমিক শূন্য ২ ডলারে পৌঁছায়।

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় তেলের দামে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। ইরানের কর্মকর্তারা গত বুধবার জানান, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে তেহরানের সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাব যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে। তবে সে জবাবে কী বলা হয়েছে, তা তারা প্রকাশ করেননি।

এর আগে ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি এক সপ্তাহের মধ্যে পুনরায় খুলে দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু শর্ত পূরণের দাবি জানানো হয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক দিন আগে প্রকাশ্যে ইরানের ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ। তাই এ অঞ্চলে যুদ্ধ ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে তেলের দামেও তার প্রভাব পড়ে। যুদ্ধের জেরে তেলের দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি বা তার ওপরে থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতেও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিকে জাপানের অর্থনীতির বিষয়ে কিছুটা ইতিবাচক তথ্য মিলেছে বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব জাপানের (বিওজে) ত্রৈমাসিক ট্যাংকান জরিপে বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক আস্থা বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের জরিপে বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক আস্থা সূচক ২২ থেকে বেড়ে ২৪ হয়েছে।

জাপানের বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক আস্থা প্রায় আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক এআই ও সেমিকন্ডাক্টর চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তবে বড় অ-উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের আস্থা সূচক ৩৭ থেকে কমে ৩৫ হয়েছে।

অন্যদিকে মুদ্রাবাজারে ডলারের বিপরীতে ইয়েন আরো দুর্বল হয়েছে। প্রতি ডলারের দাম উঠেছে ১৫৮ দশমিক ২৮ ইয়েনে। আগের দিন তা ছিল ১৫৭ দশমিক ৩৩ ইয়েন। ইউরোর দামও কমেছে গতকাল। প্রতি ইউরোর মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ১২৯৬ ডলার, যা আগের দিন ছিল ১ দশমিক ১৩৩৪ ডলার।

সব মিলিয়ে এআই ও চিপ খাতের প্রবৃদ্ধির আশাবাদ কিছু বাজারে শেয়ারদর বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। তবে ইরান যুদ্ধ, তেলের দাম ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা সে আশাবাদকে সীমিত করছে। ফলে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে এখন একদিকে প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি—দুই ধরনের প্রভাবই একসঙ্গে কাজ করছে।

আরও