ব্লকচেইন প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক বিল অব লেডিং ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের প্রথম সম্পূর্ণ ডিজিটাল রফতানি ডকুমেন্টারি কালেকশন সম্পন্ন করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এর ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে রফতানির প্রয়োজনীয় নথি প্রক্রিয়াকরণে যেখানে ৪০ দিন পর্যন্ত সময় লাগত, সেখানে তা সম্পন্ন হচ্ছে মাত্র একদিনে।
গতকাল ব্যাংকটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এ উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কাগজের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি লেনদেনকে দ্রুত, নিরাপদ ও সহজ করার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ডকুমেন্ট প্রক্রিয়াকরণে সময় কমে আসায় রফতানিকারকদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম গতিশীল করা, দক্ষতা বাড়ানো এবং কার্যকরভাবে কার্যকরী মূলধন ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হবে। এ লেনদেনে ব্র্যাক ব্যাংকের করপোরেট গ্রাহক এনএ জেড বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যভিত্তিক ফ্যাশন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ম্যাটালানের কাছে তৈরি পোশাক রফতানি করে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে রেমিটিং ব্যাংক হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংক এবং যুক্তরাজ্যে কালেক্টিং ব্যাংক হিসেবে লয়েডস ব্যাংক দায়িত্ব পালন করে।
এনিজিওর ডিজিটাল সমাধান ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে মূল বাণিজ্যিক নথি তৈরি ও হস্তান্তর করে। এসব নথির মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রনিক বিল অব লেডিং ও ডিজিটাল প্রমিসরি নোট। একটি আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ইলেকট্রনিক বিল অব লেডিং ইস্যু করে। আর ডিজিটাল ট্রেড ওয়ার্কস সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে লেনদেন সমন্বয় করে।
এ বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি ও সিইও তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ‘প্রযুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্যিক নথি প্রক্রিয়াকরণের সময় কমানো, কার্যকরী মূলধনের চক্র গতিশীল করা এবং বাংলাদেশের রফতানিকারকদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরো সক্ষম করে তোলা সম্ভব—এ অর্জন তারই প্রমাণ।’
তারেক রেফাত উল্লাহ খান আরো বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাত এবং দেশের রফতানি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করা ব্যাংকটির অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য। এনিজিওর সমাধান ও অংশীদারদের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরো দ্রুত, নিরাপদ ও স্বচ্ছ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিসহায়তার কারণেই এ ডিজিটাল বাণিজ্য সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।’
এনএ জেড বাংলাদেশের এমডি নাসির উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘ম্যাটালান এবং ব্যাংকিং অংশীদারদের সঙ্গে এ ডিজিটাল লেনদেন সফলভাবে সম্পন্ন করা তাদের জন্য বড় মাইলফলক। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ কাগজবিহীন নথি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। তাই ডিজিটাল পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক লেনদেনে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো প্রয়োজন। এসব উদ্যোগের সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিচালন ব্যয় ও গ্রাহকসেবায়।’
লয়েডস ব্যাংকের লেনদেন ব্যাংকিং পণ্যের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুরথ সেনগুপ্ত বলেন, এ লেনদেন দেখিয়েছে, ডিজিটাল বাণিজ্য কীভাবে ব্যবসায় বাস্তব সুফল বয়ে আনতে পারে। কাগজনির্ভর প্রক্রিয়ার পরিবর্তে নিরাপদ ডিজিটাল নথি ব্যবহারের মাধ্যমে বাণিজ্যিক লেনদেন আরো দ্রুত, স্বচ্ছ ও কম জটিলতায় সম্পন্ন করা সম্ভব। যুক্তরাজ্য-বাংলাদেশ বাণিজ্যিক করিডোর ডিজিটাল বাণিজ্যের বৈশ্বিক সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে।’
এনিজিওর প্রধান বিক্রয় কর্মকর্তা অ্যালেক্স ওয়েইটস বলেন, ‘৪০ দিনের প্রক্রিয়াকে একদিনে নিয়ে আসা একটি পরিমাপযোগ্য সাফল্য, যা যুক্তরাজ্য-বাংলাদেশ বাণিজ্যিক করিডোরসহ বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল বাণিজ্যের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ আরো বেশি ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে এ সুবিধার আওতায় আনতে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি।
ম্যাটালানের বাণিজ্য অর্থায়ন বিভাগের প্রধান সু অ্যাশওর্থ বলেন, ‘আগে কুরিয়ারে কাগজপত্র আসার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। ডিজিটাল পদ্ধতির ফলে নথি আদান-প্রদানে উল্লেখযোগ্য সময় সাশ্রয় হয়েছে। এতে পণ্যের মজুদ ব্যবস্থাপনা আরো দক্ষ হয়েছে এবং চালান বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকিও কমেছে। এটি দক্ষতা ও টেকসই কার্যক্রমের বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন, যার সুফল গ্রাহকরাও পাবেন।’
ডিজিটাল ট্রেড ওয়ার্কসের মেরিসা লি গিম্পেল বলেন, ‘ডিজিটাল বাণিজ্য তখনই কার্যকর হয়, যখন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ একসঙ্গে কাজ করে এবং প্রতিটি নথি ডিজিটাল পদ্ধতিতে আদান-প্রদান করা সম্ভব হয়। এ লেনদেনে বিল অব লেডিং ও প্রমিসরি নোটসহ প্রতিটি নথি ডিজিটাল করার ফলেই ৪০ দিনের প্রক্রিয়া একদিনে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। এ বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা সার্কুলারগুলো এ অর্জন সম্ভব করেছে। ডিজিটাল বাণিজ্যকে পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দিতে এ ধরনের নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’