তীব্র তাপপ্রবাহে যুক্তরাজ্যের ক্ষতি ১৫০ কোটি ডলার

যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক তীব্র তাপপ্রবাহে দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত এসেছে। মাত্রাতিরিক্ত গরমে কেবল জুনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ডই ভাঙেনি, বরং দেশের উৎপাদনশীলতায় বড় ধস নেমেছে।

এক গবেষণা অনুযায়ী, তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে দেশটির অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ ১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন পাউন্ড বা প্রায় ১৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের শ্রমশক্তির বিপুল পরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। খবর টাইম ম্যাগাজিন।

জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত গ্রান্থাম রিসার্চ ইনস্টিটিউট অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড দ্য এনভারয়নমেন্ট এবং ইউরো-মেডিটেরিনিয়ান সেন্টার অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (সিএমসিসি) যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে আসে।

তাপমাত্রা রেকর্ড ভাঙল, ব্যাহত জীবনযাত্রা

গত ১৮ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত টানা তাপপ্রবাহে ব্রিটেনে ১৮৮৪ সালের পর সবচেয়ে উত্তপ্ত মাস জুন রেকর্ড করা হয়। এ সময় প্রতিদিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায়ই ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস) অতিক্রম করে। গত ২৬ জুন নরফোকের লিংউডে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি ছিল যুক্তরাজ্যে জুনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।

তীব্র গরমের কারণে যুক্তরাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রমে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। অতিরিক্ত তাপে রেললাইন বেঁকে যাওয়ার ঝুঁকিতে অসংখ্য ট্রেনের সময়সূচি বাতিল ও বিলম্বিত হয়। একই সঙ্গে বহু দোকানপাট, অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

দেড় বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি

গ্রান্থাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক এলিজাবেথ রবিনসন ও সিএমসিসির পরিবেশ অর্থনীতিবিদ শৌর্য দাশগুপ্ত ২২ জুন থেকে এক সপ্তাহ কর্মীদের ওপর তাপপ্রবাহের প্রভাব বোঝার জন্য একটি বিস্তৃত জরিপ পরিচালনা করেন। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন খাতের ১ হাজার ৯৫০ জন প্রাপ্তবয়স্ক কর্মীর ওপর জরিপটি চালানো হয়।

জরিপে কাজের সময়, কর্মক্ষেত্রে প্রচেষ্টা, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, ঘুমের অসুবিধা, যাতায়াতের মাধ্যম পরিবর্তন ও কাজের পরিবেশের মতো বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা হয়। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকরা হিসাব করে জানান, এক সপ্তাহে উৎপাদন বন্ধ বা হ্রাস পাওয়ায় যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে দেড় বিলিয়ন ডলারের বেশি।

গবেষক এলিজাবেথ রবিনসনের মতে, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি। তিনি জানান, গরমে কর্মীদের কাজের গতি বা কর্মক্ষমতা কতটা কমেছে, তা গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

কর্মঘণ্টার অপচয়

জরিপের ফল অনুযায়ী, তাপপ্রবাহের কারণে ওই সপ্তাহে প্রতিটি কর্মী গড়ে দশমিক ৪৭ ঘণ্টা কাজ কম করেছেন। যুক্তরাজ্যে মোট ৩ কোটি ৪৪ লাখ কর্মজীবী মানুষের হিসাবে দেখা যায়, শুধু তাপপ্রবাহের কারণে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ কর্মঘণ্টা সরাসরি নষ্ট হয়েছে। এছাড়া কর্মক্ষমতা হ্রাস ও অন্যান্য পরোক্ষ প্রভাব মিলিয়ে সামগ্রিক ক্ষতি আড়াই কোটি কর্মঘণ্টা ছাড়িয়ে গেছে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন খোলা আকাশের নিচে ও শারীরিকভাবে পরিশ্রমসাধ্য কাজে নিয়োজিত কর্মীরা। নির্মাণ খাত ও কৃষি খাতের শ্রমিকরা তাপমাত্রার সরাসরি শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে অফিস কর্মীদের ক্ষতি কিছুটা কম হয়েছে।

জরিপে অংশ নেয়া মোট কর্মীর ৩ দশমিক ৬ শতাংশ জানান, অসহ্য গরমের কারণে তারা ওই সপ্তাহে পুরোটা সময় কাজ করতেই পারেননি। সার্বিক জনসংখ্যার হিসাবে এ সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার কর্মীতে।

গরমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা

তাপপ্রবাহের প্রভাবে দেশের কর্মজীবী মানুষ নিজেদের কাজের ধরন বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে কাজের সময়সূচি পরিবর্তন করেছেন, কাজের স্থান বা যাতায়াতের পথ বদলেছেন।

অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও জলবায়ু ঝুঁকি

বিশ্লেষকরা বলছেন, গবেষণাটি যুক্তরাজ্যের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। যুক্তরাজ্য মূলত একটি শীতপ্রধান দেশ। এখানকার বেশির ভাগ বাড়িঘর ও ভবন অনেক পুরনো ও এমনভাবে তৈরি, যাতে ভেতরে তাপ আটকে থাকে। ফলে গ্রীষ্মকালে তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হলে এসব ভবন হিটার বা চুল্লির মতো গরম হয়ে ওঠে।

এলিজাবেথ রবিনসন বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের পুরো অবকাঠামো শীতল আবহাওয়ার জন্য উপযোগী করে তৈরি। কিন্তু এখন সেখানে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মতো গরম পড়ছে। যে ভবনগুলো আমাদের গরম রাখার জন্য তৈরি হয়েছিল, সেগুলো এখন প্রখর তাপে আমাদের অতিষ্ঠ করে তুলছে।’

তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপপ্রবাহ আরো ঘন ঘন ও তীব্র হবে। কিন্তু সে অনুযায়ী ব্রিটেন জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে খুবই পিছিয়ে রয়েছে।

গবেষক শৌর্য দাশগুপ্ত বলেন, ‘দাবপ্রবাহের অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব এখন এতই স্পষ্ট যে এটিকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। সরকার ও ব্যবসায়ীদের এখনই অবকাঠামো উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজনে পর্যাপ্ত অর্থ বিনিয়োগ করা জরুরি।’

আরও