২০২৫-২৬ অর্থবছর

কৃষিপণ্যের রফতানি আয় কমলেও ফুল-ফলে প্রায় দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধি

সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাত থেকে বাংলাদেশের রফতানি আয় কমেছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ।

দেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের রফতানি আয় বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাত থেকে বাংলাদেশের রফতানি আয় কমেছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ। এ সময়ে কৃষিপণ্য রফতানি করে আয় হয়েছে ৯৭ কোটি ৮১ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৯৯ কোটি ৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরে রফতানি আয় কমেছে ১ কোটি ২৩ লাখ ডলার। তবে সর্বশেষ অর্থবছরে কৃষিপণ্যের প্রধান একটি উপখাত ফুল ও ফল রফতানি থেকে আয় বেড়েছে ৮৮ দশমিক ৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিপণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছিল ৯৯ কোটি ৪ লাখ ডলার। সর্বশেষ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯৭ কোটি ৮১ লাখ ডলারে। তবে কৃষিপণ্যের প্রধান কয়েকটি উপখাতে এ সময় ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সবজি রফতানি থেকে আয় ৮ কোটি ৯ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৮ কোটি ৮৩ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। মসলা রফতানি আয়ও ৫ কোটি ৬৪ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলারে উঠেছে, যা ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।

সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি এসেছে ফল ও ফুল রফতানিতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাত থেকে রফতানি আয় হয়েছিল ৬ কোটি ৭৪ লাখ ডলার। সর্বশেষ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১২ কোটি ৭৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় বেড়েছে ৫ কোটি ৯৯ লাখ ডলার বা ৮৮ দশমিক ৯ শতাংশ।

সবজি, ফল-ফুল ও মসলা থেকে রফতানি আয় বাড়লেও সামগ্রিক কৃষিপণ্য রফতানি আয় কমার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে তামাক ও অন্যান্য পণ্যের রফতানি আয় কমে যাওয়া। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাকপণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছিল ২৫ কোটি ২৭ লাখ ডলার। সর্বশেষ অর্থবছরে তা প্রায় ২২ শতাংশ কমে ১৯ কোটি ৭৪ লাখ ডলারে নেমেছে। একই সময়ে শুকনো খাবার বা ড্রাই ফুডের রফতানি আয়ও কমেছে ২৩ লাখ ডলার।

এদিকে তেলবীজ আমদানিতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তেলবীজ আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ১০ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ১৪৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩৭ কোটি ১০ লাখ ডলার বা ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

কৃষিপণ্যের রফতানি কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়ার পেছনে বেশ কয়েকটি সংকট রয়েছে বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মান ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা, পণ্য পরীক্ষার দুর্বল ব্যবস্থা, আধুনিক প্যাকেজিং ও কোল্ডচেইনের ঘাটতি অন্যতম। পাশাপাশি রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য ও নতুন বাজার তৈরির ঘাটতি, মূল্য সংযোজনকারী বা ভ্যালু অ্যাডেড পণ্যের বাজার তৈরি করতে না পারা, কৃষক-রফতানিকারকের মধ্যে দুর্বল সমন্বয় এবং উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ যেসব কৃষিপণ্য রফতানি করছে, তার ক্রেতা মূলত প্রবাসী বা বাংলাদেশী কমিউনিটি। পণ্য ইউরোপে গেলেও সেখানকার স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে যাচ্ছে না; বরং বাংলাদেশী কমিউনিটির সুপারশপে যাচ্ছে। কারণ এসব দেশের মানুষ যে মান বা মূল্যের পণ্য চাচ্ছে, বাংলাদেশ তা উৎপাদন করতে পারছে না। তাদের মান অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করতে পারলে এসব দেশের বাজার ধরা সম্ভব হবে।’

কৃষিপণ্য রফতানিতে বাংলাদেশের কিছু ভুল নীতি রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত উৎপাদন হওয়া পণ্যই রফতানি করতে হবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’ উদাহরণ হিসেবে অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম আলুর কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বাংলাদেশে আলুর উৎপাদন বেশি হওয়ায় এর রফতানি বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। এজন্য বিভিন্ন জাতও আনা হয়েছে, কিন্তু এটি ভুল নীতি। ইউরোপের অনেক দেশেই আলু উৎপাদন হয়। ফলে সেখানে আলু রফতানি সবসময় লাভজনক হবে না।’

তার মতে, বাংলাদেশকে সঠিক পরিকল্পনা করতে হবে। সব পণ্য রফতানি করা সম্ভব নয় এবং সব পণ্যের সম্ভাবনাও এক নয়। তাই প্রথমে অগ্রাধিকার ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নির্ধারণ করতে হবে।

কৃষিপণ্যের রফতানি আয় না বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে রফতানি-সংক্রান্ত কমপ্লায়েন্সের বিষয়টি তুলে ধরেন অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে কৃষিপণ্যের জন্য নিজস্ব কিছু মানদণ্ড রয়েছে, সেগুলোও অনুসরণ করতে হবে। কৃষিতে বর্তমানে গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস (জিএপি) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রফতানি আয় বাড়াতে হলে এটি অবশ্যই মানতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে নীতিসহায়তা ও প্রণোদনা দিতে হবে।’

আরও