রয়টার্সের অনুসন্ধান

নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরানের জেট ফুয়েলকে ডিজেল দেখিয়ে আমদানি মিয়ানমারের

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ‘রিফ’ নামের একটি তেলবাহী জাহাজ মিয়ানমারের জলসীমায় পৌঁছায়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান থেকে আমদানি করা জেট জ্বালানিকে কাগজপত্রে ডিজেল হিসেবে দেখিয়েছে মিয়ানমার। এ কাজে দেশটির সামরিক জান্তার সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে উঠে এসেছে রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে। জ্বালানি আমদানির নথিতে পণ্যের পরিচয় বদলে দেয়া হলেও জাহাজের চলাচল, স্যাটেলাইট চিত্র ও পণ্য পরিবহনের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকৃত চালানের বিষয়ে প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ‘রিফ’ নামের একটি তেলবাহী জাহাজ মিয়ানমারের জলসীমায় পৌঁছায়। জাহাজটিতে ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ব্যারেল জ্বালানি। নথিতে এ চালানকে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমদানি করা ডিজেল হিসেবে দেখানো হয়েছিল। তবে প্রকৃতপক্ষে জ্বালানিটি ইরান থেকে আনা জেট ফুয়েল ছিল।

মিয়ানমারভিত্তিক জ্বালানি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ডায়নামিক ওয়েভ ছিল চালানটির ক্রেতা। প্রতিষ্ঠানটি থাইল্যান্ডের টাওয়ান-অয়েল ট্রেডিংয়ের সঙ্গে ১ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের একটি বিক্রয় চুক্তি করে। চুক্তিতে দক্ষিণ আফ্রিকার ডিজেল আমদানির কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু জাতিসংঘ ও জ্বালানিবিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সার তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে মিয়ানমারে এ ধরনের কোনো ডিজেল বাণিজ্য হয়নি।

জাহাজটির যাত্রাপথ বিশ্লেষণ করে স্যাটেলাইটভিত্তিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান সিনম্যাক্স ইন্টেলিজেন্সও জানায়, রিফ ইরানের বন্দর আব্বাস থেকে জ্বালানি নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে যাত্রা করেছিল।

রয়টার্সের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, জ্বালানিবাহী জাহাজটি পৌঁছার কয়েক দিন আগে মিয়ানমারের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আমদানিসংক্রান্ত নথিতে জেট ফুয়েলের পরিবর্তে ডিজেল উল্লেখ করার কথা জানায়। গত বছরের ৩০ নভেম্বরের একটি চিঠিতে এ বিষয়ে নির্দেশনার উল্লেখ ছিল।

চিঠিতে ডায়নামিক ওয়েভ ও প্রতিষ্ঠানটির ক্রেতা ন্যাশনাল এনার্জি প্রাইম এভিয়েশন সার্ভিসেস কোম্পানিকে টাওয়ানকে অর্থ পরিশোধের অনুমোদনও দেয়া হয়।

তবে এ জ্বালানি চালান ও নথিতে পণ্যের পরিচয় পরিবর্তনের বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের উত্তর দেয়নি ডায়নামিক ওয়েভ এবং ন্যাশনাল এনার্জি প্রাইম।

২০২১ সালে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। এরপর দেশটিতে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, এ সংঘাতে সামরিক বাহিনীর উড়োজাহাজ হামলায় হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকও রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় ব্যবহারের আশঙ্কা উল্লেখ করে ২০২৩ সালে মিয়ানমারের জেট জ্বালানি খাতের ওপর নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইরানের তেল ও জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি রয়েছে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের চালানটিই এ ধরনের প্রথম ঘটনা নয়। একই বছরের মে মাসে ডায়নামিক ওয়েভ টাওয়ানের কাছ থেকে ২ লাখ ২ হাজার ব্যারেল জ্বালানি কেনার চুক্তি করে বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ওই চুক্তিতেও জ্বালানিকে দক্ষিণ আফ্রিকার ডিজেল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর মূল্য ছিল ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এক মাসের মধ্যে ইয়াঙ্গুন বন্দরে চালানটি পৌঁছানোর কথা ছিল।

তবে চালানের ইনভয়েসে থাকা তথ্য থেকে জ্বালানিটি জেট ফুয়েল হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির জেট ফুয়েল বিশেষজ্ঞ জোশুয়া হেইন ও জ্বালানিবিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্লাটসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নথিতে উল্লেখ করা জ্বালানির ঘনত্ব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিক্রি হওয়া ডিজেলের চেয়ে জেট ফুয়েলের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া জ্বালানিটির দাম আন্তর্জাতিক ডিজেলের বেঞ্চমার্ক দামের চেয়ে ৫০ শতাংশেরও বেশি ছিল।

চালানসংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ‘নোবল’ নামের আরেকটি ট্যাংকার ওই বছরের ১৭ জুন ইয়াঙ্গুন বন্দরে পৌঁছায়। জাহাজটির প্রায় দুই লাখ ব্যারেল জেট ফুয়েল ডায়নামিক ওয়েভের জন্য নির্ধারিত ছিল। সিনম্যাক্সের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণেও জাহাজটির ইরানের বন্দর আব্বাস থেকে যাত্রা করার তথ্য পাওয়া যায়।

রয়টার্সের অক্টোবরের আরেকটি প্রতিবেদনেও বলা হয়, চলতি বছর ইরান থেকে মিয়ানমারে জেট ফুয়েল সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।

অনুসন্ধান বিশ্লেষণকারীরা বলছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইরান ও মিয়ানমারের জ্বালানি বাণিজ্যে বাধা তৈরি করলেও তা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। বরং জ্বালানির প্রকৃত উৎস ও ধরন আড়াল করতে জটিল নথিপত্র এবং পরিবহন ব্যবস্থা ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। এতে ইরান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ চলাচল ও হামলার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ ধরে রাখতে পারছে।

আরও