প্রাক-বাজেট আলোচনায় আইসিএমএবি

অভিজাত ক্লাবের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে অগ্রিম আয়কর নেয়ার প্রস্তাব

কর অব্যাহতি প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, কর অব্যাহতির কথা বলবেন না। কর দিয়ে কেউ দেউলিয়া হয় না। সৈয়দ মুজতবা বলেছেন, বই কিনে দেউলিয়া হয় না। আমি বলব কর দিয়ে দেউলিয়া হয়েছে বলে শুনি নাই। কর তো আয়ের ওপর, ব্যয়ের ওপর না। তাহলে দিতে সমস্যা কোথায়। নতুন করে কর অব্যাহতি দেয়ার কথা বলবেন না। আমরা চাই যতটুকু আছে তাও কমিয়ে আনা, ধীরে ধীরে কর অব্যাহতি তুলে দেয়া।

অভিজাত ক্লাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে অগ্রিম আয়কর নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)।

মঙ্গলবার (১১ মার্চ) এনবিআরের প্রধান কার্যালয়ে প্রাক-বাজেট আলোচনায় আইসিএমএবির প্রেসিডেন্ট মাহতাব উদ্দিন বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেন। আয়কর আইনে এ বিধানটি নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ অথবা সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের অধীন নিবন্ধিত ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদের কোনো পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করার আগে ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর পরিশোধ করার বিধান যুক্ত করা যেতে পারে। এতে আয়কর নথি নেই এমন করদাতাদেরকে আয়করের আওতায় আনা সম্ভব হবে। কর আদায় বৃদ্ধি পাবে। যাদের আয়কর নথি আছে, তারা পরিশোধিত অগ্রিম আয়করের ক্রেডিট নিতে পারবেন বিধায় বাড়তি করের চাপ পড়বে না।

আইসিএমএবি ব্যক্তি শ্রেণীর কর দাতাদের জন্য আলাদা কর দিবস, সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে আয়করের উচ্চহার যৌক্তিক করা, কৃষিজাত পণ্যের উৎসে কর কর্তনের প্রস্তাবও দিয়েছে।

প্রাক-বাজেট আলোচনায় এদিন বাজেট প্রস্তাবনা তুলে ধরে দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি), দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি), ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি), বাংলাদেশ ট্যাক্স ল’ইয়ার্স এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনাল ফোরাম, বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকেলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা), বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএএ), বাংলাদেশ সিরামিকস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমইএ), রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন (রিহ্যাব) ও লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলএফএমইএবি)।

ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড গাড়ির শুল্ক হ্রাসের অনুরোধ জানিয়েছে বারভিডা। এছাড়া ১০-১৫ আসনবিশিষ্ট হাইয়েস প্রকৃতির মাইক্রোবাসের ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, অবচয় হার পুনর্নির্ধারণ, হাইব্রিড গাড়ির সিসি স্লাব ও সম্পুরক শুল্ক হার পুনর্বিন্যাস, ফসিল ফুয়েলচালিত গাড়ির সিসি স্লাব ও সম্পূরক শুল্ক হার পুনর্বিন্যাসসহ বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছে বারভিডা। সংস্থাটির সভাপতি আবদুল হক এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন। সেক্রেটারি জেনারেল রিয়াজ রহমান উপস্থিত ছিলেন।

রিহ্যাব নিবন্ধন খরচ হিসেবে গেইন ট্যাক্স ৪ শতাংশ, স্ট্যাম্প শুল্ক ১ শতাংশ, নিবন্ধন ফি ১ শতাংশ, স্থানীয় সরকার ফি ১ শতাংশ ও সব ধরনের ভ্যাট ২ শতাংশ নির্ধারণসহ বেশ কিছু দাবি জানিয়েছে। তবে বহাল থাকা কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বিষয়ে তারা কোনো প্রস্তাব দেয়নি।

শিপিং এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা ২০২৪ চূড়ান্ত করাসহ বেশ কিছু দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন।

সংগঠনটির পরিচালক এ এইচ এম কামাল বলেন, বিগত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে নতুন শিপিং এজেন্ট লাইসেন্স ইস্যু করা হচ্ছে না। এনবিআর প্রস্তাবিত শিপিং এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা ২০২৪ এখনো অনুমোদিত না হওয়ায় এ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এর ফলে শিপিং বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ও কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে শিপিং এজেন্ট হিসেবে প্রতিনিধিত্বকারী ব্যবসায় প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চাহিদা পূরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি এনবিআরকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিধিমালাটি চূড়ান্ত ও অনুমোদনের অনুরোধ জানান।

বিএসএএ প্রস্তাবিত বিধিমালা চূড়ান্ত করার আগে তাদের প্রস্তাবনা এবং যুক্তিগুলো বিবেচনা করার জন্য এনবিআরকে অনুরোধ করেছে। প্রয়োজনে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিধিমালাটি চূড়ান্ত করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

এছাড়া বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারস অ্যাসোসিয়েশন এবং ফেডারেশন অব বাংলাদেশ সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরাও তাদের প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।

বিসিএমইএ সভাপতি ও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত মুন্নু সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম বলেন, দেশীয় টাইলস পণ্যের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ও স্যানিটারির ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হলে দাম কমবে এবং ব্যবহার বাড়বে।

বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আয়কর আদায়ে বড় পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানিয়েছে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)। তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশে ব্রাঞ্চ অফিস কিংবা লিয়াজোঁ স্থাপন করলেও আয়ের ওপর কর দিচ্ছে না বিদেশী প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কেবল উৎসে কর নিয়ে খুশি থাকছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। চুক্তির ফাঁকফোকরে আয়কর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

আইসিএবির পক্ষ থেকে বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেন কনসালটেন্ট স্নেহাশীষ বড়ুয়া। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী কোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান যদি বাংলাদেশে আয় করে তাহলে তাকে কর দিতে হয়। আমরা গুগল, অ্যামাজনকে এখন ডিজিটাল সার্ভিসে আনতে পারব না। তারা হয়তো উল্টো ট্যারিফ বসাবে। যেসব বড় বড় প্রকল্প অতীতে হয়েছে, সেগুলো তো বাংলাদেশেই হয়েছে। তাদের কাছ থেকে কেবল উৎসে কর কর্তনের টাকা নিয়ে আমরা খুশি আছি। আমাদের কী কেবল উৎসে কর্তনের টাকা নিয়ে খুশি দিয়ে থাকা উচিত, না কী তাদের আয়ের ওপর থেকে কর আদায় করা উচিত। এটা আইনের সমস্যা নয়, এটা বাস্তবায়নের সমস্যা, যোগ করেন স্নেহাশীষ।

তিনি বলেন, এমন কিছু ট্রানজেকশন (লেনদেন) আছে যেগুলো বাংলাদেশে ধরা যায় না। কারণ এগুলো সরকার টু সরকার চুক্তির মাধ্যমে টাকাটা আসে।

তার বক্তব্যের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এটা আমরা অ্যাড্রেস করছি। সরকারি প্রকল্পে নেয়া বিষয়বস্তুর কাঠামো ঠিক করতে হবে। সেখানে আলাদা করে বলতে হবে। যখন প্রকল্পের চুক্তিগুলোর ভেটিং নেয়া হয়, তখন সেগুলো বলতে হবে। এখানে ব্যাপক কর ফাঁকির সুযোগ আছে। সমস্যাগুলো চুক্তির ভেতরে। যখন চুক্তির ভেতরেই বলে দেয় পেমেন্ট দেশের বাইরে হবে, করটা প্রকিউরমেন্ট এনটিটি দেবে কন্ডাকটর দেবে না। তখনই সমস্যাটা তৈরি হয়। এ জায়গায় আমাদের বড় দিকনির্দেশনা লাগবে।

তিনি আরো বলেন, বড় বড় প্রকল্প। এক হাজার কোটি টাকা, দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। ব্যবসাটা তারা এখান থেকে করছে, কিন্তু করটা তারা চাপিয়ে দিচ্ছে এ দেশের সরকারের ওপর। এখান থেকে বের হওয়া উচিত।

আলোচনায় জমির মৌজা মূল্য হালনাগাদকরণ প্রসঙ্গে আইসিএবির পক্ষ থেকে স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, বর্তমানে ভূমি ও ফ্ল্যাটের বাজার মূল্যের তুলনায় মৌজা মূল্য কম হওয়ায় অপ্রদর্শিত অর্থের সৃষ্টি হচ্ছে। জমির ফ্ল্যাটের মৌজা মূল্য সময় সময় হালনাগাদ করে ডাটাবেজ তৈরি করা দরকার। এর মাধ্যমে এনবিআরের রাজস্ব হ্রাস এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে তিনি বলেন, মৌজা মূল্য হালনাগাদকৃত না থাকায় বিক্রয়কারীর সম্পদের প্রকৃত মূল্য প্রদর্শিত হচ্ছে না। ফলে ওই অপ্রদর্শিত সম্পদ থেকে অর্জিত আয় প্রতিফলিত হচ্ছে না। এ মৌজামূল্যের কারণে ক্রেতাদের প্রকৃত আয়ের উৎস আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত হচ্ছে না। ফলে এনবিআর সারচার্জসহ অন্যান্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তার এ প্রস্তাবের বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, আমরা জমির প্রকৃত মূল্য মৌজা মূল্যে নিয়ে আসার পক্ষে। তবে সমস্যা হচ্ছে জমি রেজিস্ট্রেশন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। আমরা কর ব্যাপকহারে কমাতে চাই। ধীরে ধীরে এটা ন্যূনতম করতে চাই, সমস্যা হচ্ছে রাজস্ব আদায়ের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কী করবে। আমাদের কাজ আমরা করব।

কর অব্যাহতি প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, কর অব্যাহতির কথা বলবেন না। কর দিয়ে কেউ দেউলিয়া হয় না। সৈয়দ মুজতবা বলেছেন, বই কিনে দেউলিয়া হয় না। আমি বলব কর দিয়ে দেউলিয়া হয়েছে বলে শুনি নাই। কর তো আয়ের ওপর, ব্যয়ের ওপর না। তাহলে দিতে সমস্যা কোথায়। নতুন করে কর অব্যাহতি দেয়ার কথা বলবেন না। আমরা চাই যতটুকু আছে তাও কমিয়ে আনা, ধীরে ধীরে কর অব্যাহতি তুলে দেয়া।

এনবিআরের সদস্য (কাস্টমস নীতি ও আইসিটি) হোসেন আহমদ, সদস্য (আয়কর নীতি) এ কে এম বদিউল আলম, সদস্য (ভ্যাট নীতি) ড. মো. আব্দুর রউফ, সদস্য (কাস্টম: রফতানি, বন্ড ও আইটি) মো. মোয়াজ্জেম হোসেনসহ এনবিআরের প্রাক-বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন।

আরও