তবে যুদ্ধের চরম ও চূড়ান্ত খেসারত দিতে হয় পরিবেশকে। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেমে গেলেও এর প্রভাব থেকে যায় প্রকৃতি, পানি, মাটি ও জীববৈচিত্র্যে। উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান ইরান যুদ্ধেও সে ঝুঁকি বাড়ছে। \
আবুধাবিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল নিউজের বিশ্লেষণ বলছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ, বিস্ফোরিত জ্বালানি তেলের ট্যাংক ও তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় পারস্য উপসাগরের মানুষ ও সামুদ্রিক পরিবেশ বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত সমুদ্রপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অঞ্চলটির পরিবেশও ভঙ্গুর। পারস্য উপসাগরের সংকীর্ণ জলসীমায় বড় আকারে তেল ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে মাছ, প্রবালপ্রাচীর ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগেও যুদ্ধের কারণে অঞ্চলটির বড় পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটে। ১৯৯১ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের শেষ দিকে কুয়েতের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয়। এতে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে। এটি এখনো ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। বর্তমান যুদ্ধেও তেমন বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের যুদ্ধকৌশল এ ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (অ্যাডনক) কয়েকটি ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দুটি ট্যাংকারে হামলার খবর পাওয়া যায়। গত শনিবার আরো একটি ট্যাংকারে হামলা হয়। যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত কোম্পানিটির প্রায় ২০টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সর্বশেষ হামলার ঘটনায় সংযুক্ত নিন্দা জানিয়েছে আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তবে শুধু পারস্য উপসাগরেই নয়, এর আশপাশের সমুদ্রপথেও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ছে। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা দক্ষিণ লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছে। এতে কয়েকটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত ও ডুবে গেছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের মার্চে সার পরিবহনকারী জাহাজ এমভি রুবিমার ডুবে যায়। জাহাজটি থেকে জ্বালানি তেল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ে। এর পণ্যও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়লে বিষাক্ত শৈবাল জন্মাতে পারে, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে প্রবালপ্রাচীরও।
এর পরও বিভিন্ন জাহাজে হামলা অব্যাহত রয়েছে। গত মঙ্গলবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তানজানিয়ার পতাকাবাহী একটি ফেরির ছয়জন নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরে উদ্ধারকর্মীরাও হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। সৌদি আরবের সম্পদ লক্ষ্য করে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজগুলোও ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে তিহামা উপকূলের মাছ ধরার শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
কামার এনার্জির প্রধান নির্বাহী ও দ্য মিথ অব দ্য অয়েল ক্রাইসিস বইয়ের রচয়িতা রবিন এম মিলস জানান, পানিতে জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা এরই মধ্যে ইরানের উপকূলেও দেখা গেছে। দেশটির জলসীমায় সিররি দ্বীপের কাছেও তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। দ্বীপটি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল শিল্প কেন্দ্র। তবে সেখানে তেল ছড়িয়ে পড়ার কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।
তিনি জানান, পারস্য উপসাগরের পরিবেশ যুদ্ধ শুরুর আগেই নানা কারণে চাপের মধ্যে ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অঞ্চলটির তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। এতে বাড়ছে পানির লবণাক্ততা। ফলে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে প্রবাল। সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদে প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এসব প্রবালপ্রাচীরের ওপর নির্ভর করে মাছসহ বহু সামুদ্রিক প্রাণী।
উপসাগরে পানির সরবরাহও কমছে বলে জানান মিলস। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদী অঞ্চলটির দুটি প্রধান নদী। খরা, উজানে বাঁধ নির্মাণ ও সেচের কারণে দুই নদী থেকে পানির প্রবাহ কমেছে। পাশাপাশি পানি লবণমুক্ত করার কারখানা বা ডিস্যালিনেশন প্লান্ট থেকেও পরিবেশে অতিরিক্ত গরম ও বেশি লবণাক্ত পানি যাচ্ছে।
এছাড়া শহর সম্প্রসারণ ও নৌযান চলাচলের কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রবালপ্রাচীর ও অন্যান্য প্রাকৃতিক আবাসস্থল। এর সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।
পানির ক্ষেত্রে উপসাগরীয় দেশগুলোর ঝুঁকি বেশি। বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় এ দেশগুলো লবণমুক্ত করা পানির ওপর বেশি নির্ভরশীল। সৌদি আরব ছাড়া অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোয় আবাসিক পানির চাহিদার ৮৬-১০০ শতাংশ পর্যন্ত ডিস্যালিনেশন প্লান্ট থেকে যায়।
এ কারণে সমুদ্রে বড় ধরনের তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা শুধু মাছ বা প্রবালপ্রাচীরের জন্য নয়, মানুষের পানি সরবরাহের জন্যও হুমকি তৈরি করতে পারে।
কামার এনার্জির প্রধান নির্বাহীর মতে, বর্তমান যুদ্ধে পরিবেশের বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশ ‘ইকোসাইড’ বা ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা ধ্বংস করাকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো দেশও এ ধরনের ‘অপরাধকে’ স্বীকৃতি দেয়নি।