পরিবেশগতভাবে নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা ও প্রতিবেশী দেশের আপত্তি সত্ত্বেও তিব্বতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণ করছে চীন। ইয়ারলুং স্যাংপো (ব্রহ্মপুত্র) নদীর ওপর এ বাঁধ নির্মাণ করা হবে। বেইজিং থেকে ‘প্রজেক্ট অব দ্য সেঞ্চুরি’ আখ্যায়িত এ উদ্যোগ ঘোষণার পর খাতসংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। অবকাঠামো নির্মাণ কোম্পানি, জ্বালানি উন্নয়ন সংস্থা এবং পাওয়ার গ্রিড যন্ত্রপাতি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদরের এ উল্লম্ফনে চীনের মূল ভূখণ্ড ও হংকংয়ের শেয়ারবাজারের সবগুলো সূচক এখন ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। খবর সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট ও রয়টার্স।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং গত শনিবার তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্নপ্রবাহে এ প্রকল্পের সূচনা ঘোষণা করেন। এ মেগা প্রকল্পের ঘোষণা সোমবার চীনের পুঁজিবাজারে লেনদেনের শুরুতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। গতকালও বজায় ছিল এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা। শেষ করে অবকাঠামো নির্মাণ ও জলবিদ্যুৎ খাতের শেয়ারমূল্যে ব্যাপক উত্থান ঘটে। চীনা শেয়ারবাজারের সূচক গতকাল আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছে। অন্যদিকে হংকংয়ের বাজারও অনেক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে আসে।
চীনের ব্লু-চিপ সিএসআই৩০০ সূচক গতকাল দুপুর নাগাদ দশমিক ৪ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে ছিল। সাংহাই কম্পোজিট ইনডেক্স বেড়েছে দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে হংকংয়ের বেঞ্চমার্ক হ্যাংসেং সূচক দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২১ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ। সিএসআই ৩০০ সূচকও ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর সবচেয়ে উঁচু পর্যায়ে পৌঁছে।
এ প্রকল্পে জড়িত রাষ্ট্রায়ত্ত ডেভেলপার পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়নার শেয়ার সোমবার ও গতকাল দুদিনই দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বৃদ্ধির সীমায় পৌঁছায়। এছাড়া আনহুই কঞ্চ সিমেন্টের শেয়ারদর বেড়েছে ৬ শতাংশের বেশি। সোমবার জলবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতি নির্মাতা ডংফং ইলেকট্রিক ও সিমেন্ট কোম্পানি হুয়াসিনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারদরে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যায়।
গতকাল এক গবেষণা নোটে আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিটিগ্রুপের বিশ্লেষক পিয়ের লাউ বলেন, ‘এ প্রকল্প চীনের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে এবং জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানির অনুপাত বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।’
তিনি আরো জানান, এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি ইউয়ান বা ১৭ হাজার কোটি ডলারের সমতুল্য বিনিয়োগের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে ব্যয় হবে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ গ্রিড তৈরিতে অতিরিক্ত ৭৬ হাজার ৮০০ কোটি ইউয়ান বিনিয়োগ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সিটিগ্রুপ।
ইয়ারলুং সাংপো নদীটি তিব্বত ছাড়িয়ে দক্ষিণমুখী হয়ে ভারতে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্র নাম ধারণ করেছে। বাংলাদেশে সে নদী অন্য স্রোতধারার সঙ্গে মিলে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে।
চীনা সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার তথ্যানুযায়ী, প্রকল্পে পাঁচটি ধাপের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকবে। কেন্দ্রগুলোর বার্ষিক বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা হবে তিন লাখ গিগাওয়াট-ঘণ্টার সমান।
প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থান দখলে নেবে। বিনিয়োগের দিক থেকে এটি চীনের বৃহত্তম বাঁধ থ্রি গর্জেস ড্যামের পাঁচ গুণ এবং উৎপাদনক্ষমতায় হবে তিন গুণ বেশি।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ চীন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটাচ্ছে। এর মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ কার্বণের নিঃসরণের সীমায় পৌঁছতে চায় এবং পরবর্তী গন্তব্য হলো ২০৬০ সালের মধ্যে নিট-শূন্য কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্য অর্জন।
চীন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ। ইন্টারন্যাশনাল হাউড্রোপাওয়ার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, গত বছর চীন এ খাতে ১৪ দশমিক ৪ গিগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করেছে। এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে ১২০ গিগাওয়াট পাম্পড স্টোরেজ হাইড্রোপাওয়ারের লক্ষ্য ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে।
সিটিগ্রুপের বিশ্লেষণ অনুসারে, এ বাঁধ প্রকল্প ও সংশ্লিষ্ট বৃহৎ বিনিয়োগ চীনের ডংফং ইলেকট্রিক, সিয়ুয়েন ইলেকট্রিক, পিনজাও গ্রুপ ও এক্সজে ইলেকট্রিকের মতো জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও গ্রিড যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য লাভজনক হবে।
তবে কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন, প্রকল্পটির নির্মাণকাল প্রায় এক দশকের বেশি হওয়ায় বাজারের উত্তেজনা অচিরেই কমে আসতে পারে।
এছাড়া ভাটির দেশ বাংলাদেশ ও ভারতে এরই মধ্যে পানি সরবরাহ ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকেও বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। গতকাল এক বিশ্লেষণ নোটে জাপানি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দাইওয়ার বিশ্লেষক ডেনিস ইপ ও তার সহকর্মীরা লিখেছেন, ‘জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি চীনের ডিকার্বনাইজেশন লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসিত হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর পরিবেশগত প্রভাব পর্যবেক্ষণে রাখা বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’
বর্তমানে বিনিয়োগ আত্মবিশ্বাস সম্পর্কে নোমুরা প্রধান অর্থনীতিবিদ টিং লুর মত হলো, যখন বাজার ভালো চলছে, তখন বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় দেশের অর্থনীতির দুর্বল দিকগুলো উপেক্ষা করেন। তারা ধরে নেন যে সরকার পরিস্থিতি সামলাতে পারবে। এ আত্মবিশ্বাস তাদের আরো বেশি ঝুঁকি নিতে এবং বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করে।
তিনি আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনা হ্রাস, দীর্ঘমেয়াদি তহবিলকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে উৎসাহ দেয়া এবং উৎপাদন খাত নিয়ে নতুন আস্থা বিনিয়োগকারী মনের অবস্থান বদলে দিয়েছে। তবে শেয়ারবাজার গতি হারালে বিনিয়োগকারীরা আবার বাস্তব অর্থনীতির দিকে মনোযোগ দিতে পারেন। সম্ভবত ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে চীনের পুঁজিবাজার।’
এদিকে গতকাল সিএসআই ব্যাংকস ইনডেক্স ১ দশমিক ১ কমেছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতের শেয়ারদর ১ শতাংশ বেড়েছে।