কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরিতে দেশের শীর্ষ জেলা বগুড়া। স্থানীয় চাহিদার সিংহভাগই পূরণ হয় এখান থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে জেলায় তৈরি এসব পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে। বগুড়া থেকে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয় সবচেয়ে বেশি কৃষি যন্ত্রাংশ সরবরাহ হয়। কয়েক বছর ধরে পূর্বাঞ্চলেও বেড়েছে বিক্রির পরিমাণ। এ অঞ্চলের জেলাগুলোয় আগের থেকে দ্বিগুণ যাচ্ছে বগুড়ার কৃষি যন্ত্রাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বগুড়ায় হাজার কোটি টাকার কৃষি যন্ত্রাংশের বাজার রয়েছে। দেশে মোট চাহিদার ৭০-৮০ শতাংশ পূরণ হয় এ জেলা থেকে। ফাউন্ড্রিসহ এ খাতের সঙ্গে জড়িত ছোট-বড় কারখানা রয়েছে অন্তত দেড় হাজার।
বগুড়া বিসিক সূত্রে জানা গেছে, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই বগুড়ায় স্বল্প পরিসরে কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি শুরু হয়। বগুড়া বিসিক শিল্প নগরীর পাশাপাশি ফুলবাড়ি, গোহাইল রোড, রেলওয়ে মার্কেট, শাপলা মার্কেট, কাটনারপাড়া, চারমাথাসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে এসব যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা। দেশের উত্তরাঞ্চলের ১৬টিরও বেশি জেলায় বগুড়ায় তৈরি কৃষি যন্ত্রাংশের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বরিশাল ও খুলনাসহ দক্ষিণের বেশকিছু জেলায়ও উল্লেখযোগ্য হারে ক্রয়াদেশ আসে। বেশ কয়েক বছর ধরে সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, জামালপুরসহ পূর্ব এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোয় বিক্রি বাড়ছে।
কারখানা মালিকরা জানান, বগুড়ায় উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রাংশ সহজলভ্য হওয়ার কারণে চাহিদা বাড়ছে। দেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আগেও বগুড়া থেকে কৃষি যন্ত্রাংশ বিক্রি হতো। তবে কয়েক বছর ধরে বিক্রি দ্বিগুণ বেড়েছে।
বগুড়া বিসিক শিল্প মালিক সমিতির পক্ষে আব্দুল মালেক জানান, আশির দশকে ব্যক্তি উদ্যোগে বগুড়ায়ই প্রথম ফাউন্ড্রি ও কৃষি যন্ত্রাংশ শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে। জেলায় ফাউন্ড্রি প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৬০টি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ছয় হাজার শ্রমিক কাজ করেন। ফাউন্ড্রি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ওয়ার্কশপ রয়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০টির মতো। এসব ওয়ার্কশপে কাজ করছেন আরো কয়েক হাজার শ্রমিক। উত্তরাঞ্চলভিত্তিক হলেও বেশ কয়েক বছর ধরে পূর্বের জেলা সিলেট, ময়মনসিংহ অঞ্চলে কৃষি যন্ত্রাংশ যাচ্ছে আগের থেকে বেশি।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, জেলার কারখানাগুলোয় প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে শ্যালো ইঞ্জিনের সেচ পাম্প, লায়নার, পিস্টন, হস্তচালিত টিউবওয়েল, পাওয়ার টিলারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, লেদ মেশিন, গাড়ির ব্রেক ড্রাম, করাত কল, ফ্লাওয়ার মিল, টেক্সটাইল মিল এবং অয়েল মিল, এমনকি ধান কাটার মেশিনসহ অন্যান্য মেশিনের যন্ত্রাংশ। এসব যন্ত্রাংশের ওপর দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে কমছে আমদানি চাহিদা।
বগুড়া শহরের রেলওয়ে হকার্স মার্কেটের বসাক ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের প্রোপ্রাইটার বিশ্বজিৎ বসাক জানান, তিনি লায়নার, পিস্টনসহ শ্যালো মেশিনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি ও পাইকারি বিক্রি করেন। তার মতো এমন আরো অনেকেই আছেন, যারা এ কাজ করে সংসার পরিচালনা করছেন।
জানা গেছে, নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত জেলায় কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরির চাহিদা থাকে বেশি। ফলে এ সময়ে খাতসংশ্লিষ্টরা ব্যস্ত সময় পার করেন। ইরি মৌসুমকে কেন্দ্র করে বেচাকেনাও বেড়ে যায় দ্বিগুণ। এ সময়ে কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে জানিয়েছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।
বিশ্বজিৎ বসাক বলেন, ‘ডিসেম্বর থেকে কেনাবেচা দ্বিগুণ হয়। ইরি-বোরো মৌসুম কেন্দ্র করে বিক্রি বেড়ে যায়। কাজেরও চাপ থাকে বেশি। এ সময় কৃষিকাজের জন্য শ্যালোর বিভিন্ন পার্টস, জমি প্রস্তুতের জন্য যন্ত্রাংশ এবং ধান মাড়াইয়ের যন্ত্রাংশের চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি।’
বগুড়া বিসিকের মেসার্স মিলটন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের প্রোপ্রাইটার মো. আজিজার রহমান মিলটন জানান, একটি কারখানা থেকেই প্রতিদিন ২৫-৩০ টন সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প, পিস্টন, টিউবওয়েলসহ অন্যান্য কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদন হয়। বিসিকে এ রকম প্রতিষ্ঠান রয়েছে অর্ধশতাধিক। তবে আগের তুলনায় ব্যবসায় কিছুটা মন্দা চলছে। কাঁচামালের দাম বেশি বলে আয় কম। সহজ শর্তে ঋণও মেলে না। যে কারণে আয় কমেছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৬৪ সালে জেলার ফুলবাড়ি এলাকায় সাড়ে ১৪ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয় বিসিক শিল্পনগরী। উদ্যোক্তাদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮০ সালে আরো ১৮ দশমিক ৬৭ একর জায়গা সম্প্রসারণ করা হয়। নির্মিত মোট ২৩৩টি প্লটে ৮৫টি শিল্প ইউনিট গড়ে ওঠে। আশির দশকে বগুড়ায় ধোলাইখাল মডেলে ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের পাশাপাশি ফাউন্ড্রি এবং মেটাল শিল্পের ব্যাপক বিকাশ হলেও বিসিক শিল্পনগরীতে প্লট না থাকায় উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়েই শিল্পের অনেক ইউনিট আবাসিক এলাকায় স্থাপন করতে শুরু করেন।