এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে এশিয়ার প্রধান জ্বালানি হাব সিঙ্গাপুরের ওপর। এশীয় বাজারের জরুরি চাহিদা মেটাতে ও জ্বালানি সংকট ঠেকাতে ‘এশিয়ার হিউস্টন’ নামে পরিচিত এ নগর রাষ্ট্র এখন রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সিঙ্গাপুর বন্দর, শোধনাগার ও বিশাল মজুদাগারের এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। নিজস্ব কোনো তেল বা গ্যাস উৎপাদন ব্যবস্থা না থাকলেও বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ সম্পন্ন হয় সিঙ্গাপুরসংলগ্ন মালাক্কা প্রণালি দিয়ে। বিশ্বের মোট জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিচালিত হয় এ দেশের মাধ্যমে। নিউইয়র্ক ও লন্ডনের পর সিঙ্গাপুরই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জ্বালানি বাজার।
বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুরের জ্বালানি কেনাবেচার স্থানীয় বাণিজ্যিক কার্যালয়গুলো এখন ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের গ্রাহকরা চুক্তি বজায় রাখতে এবং জ্বালানি তেলের চালান নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বর্তমানে সিঙ্গাপুরের জুরং দ্বীপে অবস্থিত এক্সনমবিল ও শেভরনের মতো শীর্ষ বিশ্বমানের শোধনাগারগুলো বিকল্প উৎস থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এনে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। পাশাপাশি দেশটির ১৩ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল ধারণক্ষমতার বিশাল ভূগর্ভস্থ মজুদও ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে সিঙ্গাপুরের ওপর চাপ আরো বাড়বে। এরই মধ্যে কিছু সরবরাহকারী চুক্তি অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে না পেরে ‘ফোর্স মেজিউর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতিজনিত নোটিস জারি করেছে।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় এবং নিজেদের মজুদ ঠিক রাখতে সিঙ্গাপুর সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করছে। সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে তারা একটি চুক্তি সই করেছে, যার লক্ষ্য বিমান ও সমুদ্রপথ উন্মুক্ত রেখে জ্বালানিসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সচল রাখা। একই ধরনের আলোচনা চলছে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও।
এদিকে বিশ্বের বৃহত্তম জাহাজ রিফুয়েলিং কেন্দ্র হিসেবেও সিঙ্গাপুর বন্দরের ওপর চাপ বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ফুজাইরাহ বন্দরের মতো অন্য প্রধান কেন্দ্রগুলোয় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় অসংখ্য জাহাজ এখন সিঙ্গাপুরের ওপর নির্ভর করছে। বিশ্লেষকদের ভয়, এ অতিরিক্ত চাপের কারণে সিঙ্গাপুরের নিজস্ব সামুদ্রিক জ্বালানির মজুদ ফুরিয়ে যেতে পারে, যার ফলে হাজার হাজার পণ্যবাহী জাহাজ সাগরে আটকে পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের ঘাটতি মেটাতে এশিয়ার ব্যবসায়ীরা এখন ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি করছেন। তবে গ্রীষ্মকালে পশ্চিমা দেশগুলোয় নিজস্ব ব্যবহার বেড়ে গেলে সিঙ্গাপুরকে চীনসহ অন্য বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিতে হবে। সিঙ্গাপুর সরকার জানিয়েছে, উৎসের বহুমুখীকরণ ও আপৎকালীন মজুদ শক্তিশালী করাই এখন তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।