বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্ডের সুদহার বা ইয়েল্ড দ্রুত বাড়ছে। এর পেছনে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির বাড়তি দাম, শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সরকারের বাড়তে থাকা ঋণ। বন্ডের ইয়েল্ড বাড়ায় সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের জন্য বাড়ছে ঋণ নেয়ার খরচও। খবর এপি ও রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রে ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ড বেড়ে গত বৃহস্পতিবার প্রায় ৫ দশমিক ২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০০৭ সালের পর এটি সর্বোচ্চ। একই দিনে ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ড বেড়ে ৫ দশমিক ৪৮ শতাংশে উঠেছে। ২০০৪ সালের পর এ হার সর্বোচ্চ।
সুদহার বাড়ার প্রভাব শুধু আর্থিক বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে বাড়ে বাড়ি কেনার ঋণের সুদ, ব্যবসার ঋণের খরচ এবং সরকারের ঋণের সুদ। একই সঙ্গে শেয়ারবাজার, স্বর্ণ ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো সম্পদের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বন্ডের দাম ও ইয়েল্ডের সম্পর্ক
বন্ডকে সহজভাবে একটি ঋণপত্র বলা যায়। সরকার বা বড় কোনো প্রতিষ্ঠান যখন অর্থ ধার করতে চায়, তখন তারা বিনিয়োগকারীদের কাছে বন্ড বিক্রি করে। বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময় পর মূল অর্থ ফেরত দেয়ার পাশাপাশি সুদ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
বন্ড বাজারে কেনাবেচাও হয়। কোনো বন্ডের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমে গেলে তার দাম কমে যায়। কিন্তু বন্ডটি যে নির্দিষ্ট সুদ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা একই থাকে। ফলে কম দামে বন্ড কিনলে নতুন বিনিয়োগকারীর অর্থের ওপর ফেরতের হার বেড়ে যায়। এটিই বন্ডের সুদহার। তাই সাধারণভাবে বন্ডের দাম কমলে ইয়েল্ড বাড়ে। আবার বন্ডের দাম বাড়লে ইয়েল্ড কমে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ড বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অন্যান্য অনেক ঋণের সুদহার নির্ধারণে এটি একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ বছর মেয়াদি বাড়ির ঋণের সুদহার ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
জ্বালানি তেল ও মূল্যস্ফীতির চাপ
সাম্প্রতিক সময়ে বন্ডের ইয়েল্ড বাড়ার বড় কারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এতে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামও বাড়তে পারে।
বন্ড বিনিয়োগকারীদের জন্য মূল্যস্ফীতি বড় একটি ঝুঁকি। কারণ বন্ড থেকে ভবিষ্যতে যে অর্থ পাওয়া যাবে, মূল্যস্ফীতি বেশি হলে সে অর্থের প্রকৃত মূল্য কমে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ড ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে প্রায় ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ ছিল। এরপর তা দ্রুত বেড়েছে। গত জুনে ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) বৈঠকের পর থেকে এ ইয়েল্ড প্রায় দশমিক ৭০ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। মার্চের শুরুর তুলনায় বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট।
বাড়ছে ঋণের খরচ
বন্ডের ইয়েল্ড বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন বাজারে। দেশটিতে ৩০ বছর মেয়াদি বাড়ির ঋণের গড় সুদহার এখন প্রায় ৭ শতাংশ। যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এটি প্রায় ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
ফলে বাড়ি কিনতে চাওয়া মানুষের জন্য ঋণের খরচ বেড়েছে। একইভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও কারখানা, ডেটা সেন্টার বা নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য ঋণ নিলে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বড় বিনিয়োগের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে। বন্ডের সরবরাহ বাড়ার এটিও একটি কারণ। একই সময়ে সরকারগুলোও বেশি ঋণ নিতে নতুন বন্ড ছাড়ছে।
ফেডের সুদহার নিয়ে প্রত্যাশা
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখনো শক্তিশালী রয়েছে। সাম্প্রতিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের তথ্যেও অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এতে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মনে করছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ফেডারেল রিজার্ভকে আরো কিছুদিন সুদহার বাড়িয়ে রাখতে হতে পারে।
ফেড গত সপ্তাহে ২০২৩ সালের পর প্রথমবার নীতিসুদ বাড়িয়েছে। বাজারে এখন চলতি ও আগামী বছর আরো সুদ বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এ প্রত্যাশার কারণে স্বল্পমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইয়েল্ডও বেড়েছে।
টিডি সিকিউরিটিজের যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার কৌশল বিভাগের প্রধান গেন্নাদি গোল্ডবার্গ বলেছেন, ‘মার্চের পর ইয়েল্ড বৃদ্ধির বড় অংশই ফেডের সুদহার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পরিবর্তনের কারণে হয়েছে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জ্বালানি তেলের বাড়তি দামও ভূমিকা রেখেছে।’
বিশ্বজুড়েই বাড়ছে ইয়েল্ড
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোয়ও বন্ডের ইয়েল্ড বাড়ছে। জার্মানির ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইয়েল্ড এ মাসে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। প্রায় ১৭ বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ। জার্মানির অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৬ সালে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের ঋণ নেয়ার পরিমাণ রেকর্ড ৫২ হাজার ৫৫০ কোটি ইউরোয় পৌঁছতে পারে।
জাপানের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইয়েল্ডও গত বৃহস্পতিবার প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশে উঠেছে। ১৯৯৬ সালের পর এটি সর্বোচ্চ। অথচ ২০২০ সালেও জাপানের এ বন্ডের ইয়েল্ড ঋণাত্মক ছিল।
বন্ডের ইয়েল্ড বাড়লে সঞ্চয়কারীরা অবশ্য কিছুটা সুবিধা পেতে পারেন। কারণ ব্যাংকের উচ্চ সুদের সঞ্চয় হিসাব বা বন্ডে টাকা রাখলে তারা বেশি সুদ পেতে পারেন। তবে সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ ইয়েল্ড থাকা মানে ঋণ ও পুরনো ঋণ পুনঃঅর্থায়নের খরচ বেড়ে যাওয়া।