ক্লিন ও বিডব্লিউজিইডির সংবাদ সম্মেলন

নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে ২৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আগামী বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার দাবি জানিয়েছে পরিবেশবাদী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

তারা ব্যক্তিগত, সমবায় ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ আবর্তনশীল তহবিল গঠনের প্রস্তাব করেন, যেখান থেকে উদ্যোক্তারা ৫ শতাংশের কম সুদে ঋণ পেতে পারেন।

রাজধানীর বাংলামোটরে একটি রেস্তোরাঁয় গতকাল ‘জ্বালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য উৎস: চাই বাজেটের নীতিগত পরিবর্তন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি) এবং সহ-আয়োজক হিসেবে ছিল বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ (ইটিআই), ল-ইয়ার্স ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (লিড) এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। অনুষ্ঠানে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ক্লিনের নেটওয়ার্কিং অ্যাডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা। আলোচনায় অংশ নেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক (অধিকার ও সুশাসন) বনশ্রী মিত্র নিয়োগী, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম, লিডের গবেষণা পরিচালক অ্যাডভোকেট শিমনউজ্জামান এবং ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে দেশে জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট সক্ষমতা মাত্র ১ হাজার ৬৭৯ মেগাওয়াট, যা জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। বাংলাদেশে সৌর ও বায়ুশক্তি মিলিয়ে ১ লাখ ৩২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও নীতিগত বাধা এবং অর্থায়নের অভাবে এ খাতটি পিছিয়ে রয়েছে।

বক্তারা অভিযোগ করেন, যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে নানা সুবিধা দেয়া হচ্ছে, সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামের ওপর ২৭-৬১ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ কর ও শুল্কারোপ করে এ খাতের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা ১০ বছরের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সব সরঞ্জামের কর ও শুল্ক প্রতীকী ১ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানান। তারা উল্লেখ করেন, প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বছরে ৩ কোটি ১১ লাখ টাকার জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় করতে পারে এবং ১ হাজার ১৮০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ রোধ করে। এছাড়া প্রতি কিলোওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বছরে প্রায় ৩১ হাজার টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে সক্ষম।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও সাধারণ নাগরিকদের এ রূপান্তরে সম্পৃক্ত করতে আবাসিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রতি কিলোওয়াটে কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা সরাসরি ভর্তুকি দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এক্ষেত্রে নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ১০ শতাংশ ভর্তুকির সুপারিশ করা হয়। এ বিশাল বিনিয়োগের জোগান দিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ আবর্তনশীল তহবিল গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সুদমুক্ত তহবিল প্রদান করবে, যা থেকে উদ্যোক্তারা ৫ শতাংশের কম সুদে ঋণ সুবিধা পাবেন।

ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানিতে অব্যাহত ভর্তুকি ও প্রণোদনার পরিবর্তে আসন্ন বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার, কর-শুল্ক অব্যাহতি এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।’ এখনই এ পরিবর্তন না আনলে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আমদানিনির্ভরতার এক দীর্ঘস্থায়ী চক্রে আটকে থাকার ঝুঁকিতে পড়বে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

বিএসআরইএর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত এখনো প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা পাচ্ছে না। সরকার চাইলে আসন্ন বাজেটে কর ও শুল্ক কমিয়ে সৌর ও বায়ুশক্তিতে বিনিয়োগের পথ সহজ করতে পারে। এটিই হবে জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সবচেয়ে কার্যকর বিনিয়োগ।’

বনশ্রী মিত্র নিয়োগী বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি আমাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পরিবেশ রক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিশেষত নারী ও আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা আছে, তাই তাদের সময় দেয়া উচিত। তবে সরকারকে তাদের নির্বাচনী ইশতাহারের কথা বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে, কারণ এটি দেশের উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত।’

আরও