প্রাতিষ্ঠানিক কাজের সময় শেষ হওয়ার পরও অনেক মানুষের শ্রম শেষ হয় না। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পর শুরু হয় ঘরের আরেক দফা কাজ। ঘর পরিষ্কার, রান্না, সন্তানদের দেখাশোনা কিংবা পরিবারের প্রয়োজনীয় নানা কাজ করতে হয়। এসব কাজের জন্য আলাদা কোনো মজুরি পাওয়া যায় না। ফলে অর্থনীতিতে এর মূল্য থাকলেও তা মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির হিসাবে উঠে আসে না। খবর ফরচুন।
যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের অবৈতনিক গৃহস্থালি শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য বছরে ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। দেশটির সরকারি সংস্থা গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস (জিএও) সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ হিসাবের তথ্য দিয়েছে। এ অর্থের পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমান। অর্থাৎ দেশটির অর্থনীতির একটি বড় পরিমাণ শ্রম ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ড সরকারি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।
অবৈতনিক শ্রম বলতে সরাসরি কোনো মজুরি না পাওয়া কাজকে বোঝায়। যেমন রান্না করা, ঘর পরিষ্কার করা, কাপড় ধোয়া ও সন্তানদের দেখাশোনা করা। অর্থনীতিবিদরা এসব শ্রমের একটি আনুমানিক আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন। এর জন্য সাধারণত একজন ব্যক্তি এসব কাজে কত সময় ব্যয় করছেন, তা হিসাব করা হয়। এরপর একই ধরনের কাজের জন্য বাইরের বেতনভুক্ত কাউকে নিয়োগ করলে যে মজুরি দিতে হতো, তার সঙ্গে সে সময়ের তুলনা করা হয়।
জিএওর সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী যুক্তরাষ্ট্রের ৮৭ শতাংশের বেশি মানুষ একটি সাধারণ দিনে কোনো না কোনো ধরনের অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজ করে। এসব কাজে তারা গড়ে ৩ দশমিক ৭২ ঘণ্টা সময় দেয়। তবে এর বিনিময়ে অর্থ লেনদেন না হওয়ায় তা জিডিপিতে যুক্ত হয় না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গৃহস্থালি শ্রমকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এ শ্রমের ওপরই আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভর করে। পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই রান্না, সন্তান দেখাশোনা ও ঘরের অন্যান্য কাজ না করলে এসব সেবার জন্য বাইরের কাউকে অর্থ দিতে হতো। ফলে পরিবারের আয় থেকে এসব সেবার পেছনে ব্যয় করতে হতো অতিরিক্ত অর্থ।
কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও জননীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মিস্টি হেগেনেস ফোরচুনকে বলেন, ‘এসব কাজ ছাড়া আনুষ্ঠানিক অর্থনীতি কার্যকরভাবে চলতে পারত না। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের রান্না ও শিশুদের দেখাশোনা বন্ধ করে দিলে সে কাজের বড় একটি অংশ সেবা খাত থেকে কিনতে হতো। এতে মানুষের চাকরি থেকে পাওয়া আয়ের প্রকৃত মূল্যও কমে যেত। কারণ জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় এসব সেবার জন্য তাদের আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে অর্থ ব্যয় করতে হতো।’
গৃহস্থালি শ্রমের বড় অংশে নারী
অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে নারীদের ওপর ছিল। সাম্প্রতিক সময়েও সে চিত্র পুরোপুরি বদলায়নি। জিএওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২৪ সাল পর্যন্ত অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের ৫৪ শতাংশ ছিলেন নারী। সন্তানদের দেখাশোনার ক্ষেত্রেও নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি সময় দিয়েছেন।
এমনকি পুরুষ সঙ্গীর তুলানায় বেশি আয় করা নারীরাও ঘরের রান্না ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে বেশি সময় দেন। জিএওর হিসাবে, এসব কাজে নারীরা তাদের কম আয় করা পুরুষ সঙ্গীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সময় দেন। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে নারীদের আয় ও ভূমিকা বাড়লেও ঘরের অবৈতনিক শ্রমের বড় অংশ তাদের ওপরই রয়েছে।
মিস্টি হেগেনেসের মতে, পরিবারের সবার প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি নারীদের একই সময়ে বেতনভুক্ত কাজ ও ঘরের কাজ সামলাতে হচ্ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক তথ্যের মধ্যে এ ‘অদৃশ্য শ্রমের’ যথাযথ প্রতিফলন নেই। ফলে নারীদের ওপর বাড়তি চাপের প্রভাব অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে সহজে বোঝা যায় না।
দ্বৈত দায়িত্বের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের চাপও যুক্ত হচ্ছে। জিএওর প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে ৪৮ শতাংশ নারী বার্নআউট বা অতিরিক্ত কাজের চাপে ক্লান্তির মুখোমুখি হন। পুরুষ সহকর্মীদের ক্ষেত্রে এ হার ৩৬ শতাংশ।
উৎপাদনশীলতার নতুন হিসাব
অবৈতনিক শ্রমের আর্থিক মূল্য নির্ধারণের অর্থ—নারীদের আবার ঘরকেন্দ্রিক জীবনে ফিরিয়ে নেয়া নয়। বরং অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় বিষয়টি এসেছে ঘরের শ্রমকে কীভাবে আরো সমানভাবে ভাগ করা যায়, তা বোঝার জন্য।
অর্থনীতিবিদ ন্যান্সি ফলব্রের মতে, অবৈতনিক শ্রমের মূল্যকে অর্থনৈতিক হিসাবে দেখা মানে অতীতের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান নয়। বরং এ শ্রমের মূল্য স্বীকার করা জরুরি। কারণ ঘরের যত্ন ও দেখাশোনার কাজও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি জানান, জিএওর প্রতিবেদন সুযোগ দিচ্ছে অর্থনীতিবিদদের প্রচলিত ‘দক্ষতা’ বা উৎপাদনশীলতার ধারণা নতুন করে ভাবার। সাধারণত একজন কর্মীর উৎপাদনশীলতা বলতে কর্মক্ষেত্রে তার কাজের পরিমাণ ও ফলাফলকে বোঝানো হয়। কিন্তু একজন মানুষ একই সঙ্গে অন্য মানুষের যত্ন নিচ্ছে, সন্তান লালন করছে কিংবা পরিবারের প্রয়োজনীয় কাজ করছে—এসব কর্মকাণ্ডও সমাজ ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ফলব্রের মতে, উৎপাদনশীলতা নিয়ে আলোচনা এতদিন মূলত অফিস কর্মীদের ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল। কিন্তু অন্য মানুষের যত্ন নেয়ার কাজের উৎপাদনশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে জিডিপির মতো প্রচলিত অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে একটি দেশের অর্থনীতির পুরো চিত্র পাওয়া যায় কিনা, সে প্রশ্নও সামনে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বছরে ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত মূল্যমানের অবৈতনিক গৃহস্থালি শ্রম জিডিপিতে নেই। অন্যদিকে সে শ্রমের ওপরই পরিবারের দৈনন্দিন জীবন ও আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভরশীল। এ কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার মান ও উৎপাদনশীলতা পরিমাপের ক্ষেত্রে অবৈতনিক শ্রমকে কীভাবে বিবেচনায় নেয়া হবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।