শীত মৌসুম শুরুর আগেই তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মজুদ ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে ঠেকেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টের শেষ নাগাদ ইইউর গ্যাস সংরক্ষণাগারগুলো গড়ে মাত্র ৬৩-৬৫ শতাংশ পূর্ণ ছিল। বছরের অন্যান্য সময়ের স্বাভাবিক ৮০ শতাংশ মজুদের তুলনায় এটি অনেক কম। বর্তমানে যে হারে গ্যাস মজুদ হচ্ছে, তাতে শীত মৌসুম শুরুর সময় ইউরোপের মজুদ পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কম থাকতে পারে। এ অবস্থায় উদ্বেগ বাড়ছে শীতকালে গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপে জ্বালানি ব্যয় আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও দ্য গার্ডিয়ান।
গ্যাসের এ সংকটের পেছনে ইউরোপীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ভুল হিসাব-নিকাশকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বছরের শুরুর দিকে জ্বালানি ব্যবসায়ীরা ভাবছিলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট দ্রুত শেষ হলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম কমবে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এলএনজি রফতানিকারক দেশ কাতার থেকে আবার নিয়মিত সরবরাহ শুরু হবে, এমন আশায় ইউরোপের গ্যাস আমদানিকারকরা কেনাকাটা পিছিয়ে দেন। কিন্তু পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি দিয়ে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর উত্তেজনার মধ্যে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় সেই হিসাব মেলেনি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পাশাপাশি ইইউ নীতিগত সিদ্ধান্ত শিথিল করায় পরিস্থিতি আরো জটিল রূপ নিয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইইউ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, প্রতি বছরের ১ নভেম্বরের মধ্যে সদস্য দেশগুলোকে অন্তত ৯০ শতাংশ গ্যাস মজুদ নিশ্চিত করতে হবে। তবে এ বছর সেই বাধ্যবাধকতা কমিয়ে ৮০ শতাংশে আনা হয়। তৎকালীন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত শান্তির আভাস দেয়া হয়েছিল, যার ভিত্তিতে ইউরোপীয় নীতিপ্রণেতারা এ শর্ত শিথিল করেন।
এরই মধ্যে ইউরোপের বাজারে পড়তে শুরু করেছে গ্যাস সংকটের প্রভাব। বর্তমানে ইউরোপে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে ৬৮ ইউরো ছাড়িয়েছে, যা বছরের শুরুর তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শীতকালে এলএনজি কার্গো পেতে এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপকে আরো তীব্র প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। এতে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা গ্যাসের দাম ১০০ ইউরো পর্যন্ত উঠে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকরা।
পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে সংকট সবচেয়ে স্পষ্ট। সবচেয়ে বড় গ্যাস সংরক্ষণাগার থাকা জার্মানিতে মজুদের পরিমাণ মাত্র অর্ধেক বা ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। বেলজিয়ামে ৫০ ও নেদারল্যান্ডসে ৪৫ শতাংশ পূর্ণ রয়েছে। অন্যদিকে ইতালি ও পোল্যান্ড তাদের লক্ষ্যমাত্রার ৮০ শতাংশের বেশি পূরণ করতে পেরেছে। ব্রিটেনের নিজস্ব মজুদক্ষমতা খুবই কম হওয়ায় তারা আমদানি সংকটে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে। এরই মধ্যে দেশটির জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফগেম গ্রাহক পর্যায়ে বিল বাড়ানোর
ঘোষণা দিয়েছে।