প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান

যৌক্তিক হলে ব্যবসায়ীদের দাবি বিবেচনায় নেয়া হবে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, ‘নানা সীমাবদ্ধতা ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার চাপে আগামী বাজেটে ব্যবসায়ীদের সব দাবি মেনে নেয়া সম্ভব হবে না।

তবে দাবি যৌক্তিক হলে তা বিবেচনায় নেয়া হবে।’ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবনে গতকাল সকালে আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান এ মন্তব্য করেন।

এদিন দুটি প্রাক-বাজেট আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে সকালের বৈঠকে ১১টি শিল্প সংগঠন অংশ নেয়। সংগঠনগুলো হলো বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ), বাংলাদেশ রি-রোলিং মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিআরআরএমএ), বাংলাদেশ আয়রন অ্যান্ড স্টিল ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএসআইএ), বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইমপোর্টার্স অ্যান্ড মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিসিআইএমএ), বাংলাদেশ পেইন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমএ), বাংলাদেশ কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিজ ইমপোর্টার্স অ্যান্ড মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিসিটিআইএমএ), লুব্রিক্যান্টস ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলআইএবি), বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএফএ), বাংলাদেশ অ্যাকুয়া প্রোডাক্ট কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিএপিসিএ), বাংলাদেশ মোটর পার্টস অ্যান্ড টিউব মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিএমপিটিটিএমএ) এবং ইলেকট্রনিকস সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএসএসএবি)।

বৈঠকে ইস্পাত শিল্পসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, মহামারী, যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনীতির দুর্বিপাক, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিময় হারজনিত ক্ষতিসহ নানা কারণে দেশের ইস্পাত ও সংশিষ্ট শিল্পগুলো এখন বেশ কঠিন সময় পার করছে। এর মধ্যেই সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এসব শিল্পে করভার ক্রমাগত বেড়েছে। বিশেষ করে ইস্পাত শিল্পের অনেক প্রতিষ্ঠান মাত্র ৪০-৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। অনেক কারখানা এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।

বৈঠকে বিএসএমএর সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা, মহামারী, যুদ্ধ, টাকার অবমূল্যায়ন, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি এবং অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম কমে যাওয়ায় ইস্পাত শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’

সংগঠনটি ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে টনপ্রতি অগ্রিম আয়কর (এআইটি) ৬০০ থেকে কমিয়ে ৫০০ টাকা, বিক্রয় পর্যায়ে উৎসে কর ২ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ ও টার্নওভার ট্যাক্স ১ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়। পাশাপাশি অগ্রিম আয়কর সমন্বয় বা ফেরতের ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছে বিএসএমএ।

সংগঠনের পক্ষ থেকে দেয়া প্রস্তাবে রি-রোলেবল স্ক্যাপ থেকে প্রস্তুতকৃত এমএস পণ্য, বিলেট ও ইনগট, এমএ পণ্য এবং বিলেট বা ইনগট থেকে প্রস্তুতকৃত এমএস পণ্যে মূসক কমিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়া হয়। এছাড়া মূসক কর্তনে অস্পষ্টতা দূর, রড ব্যবসায়ী পর্যায়ে (খুচরা) মূসক হ্রাস ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পণ্যে শুল্ক হ্রাস ও ক্ষেত্রবিশেষে তা স্থিতিশীলভাবে বহাল রাখার আহ্বান জানানো হয়।

এ সময় উপস্থিত অন্যান্য শিল্প সংগঠনের পক্ষ থেকেও আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর ও শুল্ক কাঠামো নিয়ে নিজ নিজ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।

জবাবে পণ্য আমদানিতে এইচএস কোড-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে কাজ করা হবে বলে ব্যবসায়ীদের আশ্বাস দেন এনবিআর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘এইচএস কোডের জটিলতা নিরসনে আমরা কাজ করব। তবে এর অপব্যবহার রুখতে হবে ব্যবসায়ীদেরই। আর পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করার উদ্যোগ নেয়া হবে।’

টেলিকমসেবায় সম্পূরক শুল্ক ও সারচার্জ তুলে দেয়ার প্রস্তাব অ্যামটবের:

টেলিকমসেবায় সম্পূরক শুল্ক ও সারচার্জ তুলে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব)। গতকাল বিকালে রাজস্ব ভবনে আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় সংগঠনটির পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব দেয়া হয়। বৃহৎ করদাতা হিসেবে বিবেচিত সাতটি শিল্প সংগঠন ও কোম্পানিকে নিয়ে এ আলোচনার আয়োজন করা হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এতে সভাপতিত্ব করেন।

এ সময় অ্যামটবের পক্ষ থেকে বলা হয়, বৈশ্বিকভাবে পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, বাংলাদেশে টেলিকম খাতে মোট আরোপিত কর ও সংশ্লিষ্ট ফির হার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। বৈশ্বিক পর্যায়ে টেলিকম খাতে বিভিন্ন দেশে মোট আরোপিত কর ও ফির গড় হার ২২ শতাংশ। এশিয়া প্যাসিফিকে এ হার ২৫ শতাংশ। আর বাংলাদেশে তা ৫৬ শতাংশ। এ খাতে এখন নতুন করে বিদেশী বিনিয়োগ আসছে না। তাই বিদেশী বিনিয়োগ আনতে কর ও শুল্ক খাতে বেশকিছু সংস্কার প্রয়োজন।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, টেলিকমসেবায় আরোপিত সম্পূরক শুল্ক ও সারচার্জ তুলে দিলে তা জনবান্ধব পদক্ষেপ হবে। একই সঙ্গে তা ভোক্তার ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিতেও বড় ভূমিকা রাখবে। এছাড়া অ্যামটবের পক্ষ থেকে সিম ও ই-সিমে ভ্যাট প্রত্যাহার, স্পেকট্রামের ওপর ভ্যাট বাতিল, করপোরেট কর হ্রাস ও ওটিটি সেবা থেকে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।

এ সময় বিদ্যমান কাস্টমস ও ভ্যাট সুবিধার মেয়াদ ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বলবৎ রাখার প্রস্তাব করেছে মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমআইওবি)। সংগঠনটি বলছে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নিরাপত্তা এবং গ্রে মার্কেটের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এ সময়সীমা বাড়ানো প্রয়োজন।

আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘সবাই এখন শুধু কর ও শুল্ক কমানোর কথা বলছেন। কিন্তু সবই যদি কমিয়ে দেয়া হয়, রাজস্ব বাড়বে কীভাবে।’

বিকালের আলোচনায় অ্যামটব ও এমআইওবি ছাড়াও ন্যাশনাল সিগারেট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (এনসিএমএ), বাংলাদেশ বিড়ি শিল্প মালিক সমিতি (বিবিএসএমএ), ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি), জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল (জেটিআই) ও ফিলিপ মরিস ইন্টারন্যাশনাল অংশ নেয়।

এসব সংগঠন ও কোম্পানির পক্ষ থেকে বাজারে অবৈধভাবে আনা সিগারেটকে শিল্পটির জন্য বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানান, বিদেশী ও অবৈধ সিগারেটের বাজারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজনে স্ট্যাম্পে পরিবর্তন আনা হবে। স্থানীয় কোম্পানিগুলোর সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর বা এআর কোড থাকবে। এগুলোর মাধ্যমে সরকার ওই সিগারেট থেকে কর বা রাজস্ব পেয়েছে কিনা, ভোক্তা নিজেই তা যাচাই করতে পারবেন।

আরও