আইএমএফের বিশ্লেষণ

বিকল্প উপায়ে পরিস্থিতি সামাল দিলেও কমছে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের মজুদ

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজার সবচেয়ে বড় সরবরাহ ঘাটতির মুখে পড়েছিল।

নানা পদক্ষেপে সাম্প্রতিক দশকের সবচেয়ে বড় এ ধাক্কা সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছে। তবে এ সংকট সামলাতে যেয়ে জ্বালানি তেলের জরুরি মজুদ বা বাফার স্টক এখন আশঙ্কাজনক স্তরে নেমে এসেছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতি ভবিষ্যতে যেকোনো সংকটে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। খবর দ্য বিজনেসলাইন।

আইএমএফের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাজারে জ্বালানি তেলের চাহিদা কমে যাওয়া, উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মজুদ থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহারের কারণে দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়তে পারেনি। এমনকি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকার পরও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০-১০০ ডলারের মধ্যে তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে বাজারে চাহিদার তুলনায় দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অতিরিক্ত জ্বালানি তেলের সরবরাহ ছিল। ফলে প্রাথমিক ধাক্কা সামলানো সহজ হয়। গত মার্চ-মে মাস পর্যন্ত প্রধানত তিনটি কারণে বাজারে তেলের এ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।

প্রথমত, উচ্চমূল্যের কারণে এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি তেলের ব্যবহার অনেক কমিয়ে দেয়। বাড়তি খরচের চাপ এড়াতে এ অঞ্চলের দেশগুলো কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে পড়ে। দ্বিতীয়ত, উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের উত্তোলন দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল বাড়ে। এ উত্তোলন বৃদ্ধিতে নেতৃত্ব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ভেনিজুয়েলা, গায়ানা ও রাশিয়া।

বাকি ঘাটতি মেটানো হয়েছে বৈশ্বিক মজুদ থেকে জ্বালানি তেল এনে। এর মধ্যে চীনের বাণিজ্যিক মজুদ এবং বিভিন্ন দেশের কৌশলগত জরুরি মজুদ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে আইএমএফ জানিয়েছে, ওই মাসগুলোয় দৈনিক প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল ঘাটতি থাকায় বাজারের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। জরুরি মজুদ পুনরায় বাড়ানো না হলে পরবর্তী সংকটে বিশ্বকে আরো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়, যা বিশ্বের মোট ব্যবহারের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো বড় উত্তোলক দেশগুলো বিকল্প পাইপলাইন ও বন্দর ব্যবহার করে জ্বালানি তেল পাঠানোর চেষ্টা করলেও তা ছিল মোট ঘাটতির তুলনায় খুবই সামান্য।

হিসাব অনুযায়ী, মে মাসের শেষ নাগাদ ১১০ কোটি ব্যারেলের বেশি জ্বালানি তেল বাজারে পৌঁছতে পারেনি। এ পরিমাণ জ্বালানি তেল দিয়ে পুরো বিশ্বের প্রায় ১০ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এ সংকটের আকার ১৯৭৩ সালের জ্বালানি তেলের সংকট, ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়কার ঘাটতিকেও ছাড়িয়ে গেছে।

হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি রূপরেখা চুক্তি হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমেছিল। ফলে ট্যাংকারে আটকে থাকা জ্বালানি তেল দ্রুত বাজারে ফিরে আসতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ফের যুদ্ধ শুরু হওয়ায় জ্বালানি তেলের বাজার আবার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। তাই নৌযান চলাচল কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে এবং জাহাজ ও বীমা শিল্প এতে কীভাবে সাড়া দেবে, তা নিয়ে এখনো গভীর অনিশ্চয়তা রয়েছে। আইএমএফের ধারণা, প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেয়ার পরও সরবরাহ স্বাভাবিক হতে দুই-তিন মাস সময় লেগে যেতে পারে।

এ সংকট থেকে বিশ্বনেতাদের জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে বলে মনে করে আইএমএফ। প্রথমত, ভবিষ্যতের সংকট মোকাবেলায় জ্বালানি তেলের মজুদ আবার বাড়ানো জরুরি। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সরবরাহের জন্য কেবল একটি নৌপথের ওপর নির্ভর না করে বিকল্প পথ ও উৎস তৈরি করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সাধারণ মানুষের জন্য সরকারের দেয়া ভর্তুকি সাময়িক হওয়া উচিত এবং তা কেবল সবচেয়ে অসহায় মানুষই পাওয়া উচিত, যাতে সরকারি বাজেট সুরক্ষিত থাকে এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া যায়।

আরও