তবে যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ও উচ্চাভিলাষী উদ্যোগটি নয় মাসেও কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর উদ্বোধনী সভায় গাজা পুনর্গঠনের জন্য ১৭ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। বিশ্বব্যাংকের অধীনে গঠিত মূল পুনর্গঠন তহবিলে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ জমা পড়েনি। খবর টেক টাইমস।
বোর্ড অব পিস-সংশ্লিষ্টরা জানান, তহবিলটির ব্যাংক ব্যালান্স বর্তমানে শূন্য। অন্যদিকে হামাসের বিকল্প হিসেবে গাজার শাসনভার নেয়ার জন্য গঠিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটি এখনো গাজায় প্রবেশ করতে পারেনি। অন্তর্বর্তীকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে বহুজাতিক বহুল-প্রত্যাশিত স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএফএস) গঠনের কথা ছিল, তাও মোতায়েন করা সম্ভব হয়নি।
ভূরাজনীতি বিশ্লেষক ও লেখক রিচার্ড ওয়েল বলেন, ‘যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের স্থবিরতা গাজার ২১ লাখ মানুষের জন্য কেবল কোনো নীতিগত প্রশ্ন নয়। এটি তাদের বেঁচে থাকার লড়াই। বর্তমানে গাজার ১৭ লাখেরও বেশি মানুষ ১ হাজার ৬০০টি অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে চরম অমানবিক পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় তাদের মাথার ওপর একটি স্থায়ী ছাদ পাওয়ার স্বপ্ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’
তিনি জানান, গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী শাসন ও পুনর্গঠনের পরিকল্পনাটি বেশ দ্রুত ও বড় লক্ষ্য নিয়ে সাজানো হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০ দফার একটি শান্তি পরিকল্পনা উন্মোচন করেন। এরপর অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাস এর বাস্তবায়নে সম্মত হয় এবং ১০ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে বোর্ড অব পিসের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বড় অংকের আর্থিক প্রতিশ্রুতি আসে। যুক্তরাষ্ট্র ১০ বিলিয়ন ডলার এবং কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), কুয়েতসহ নয়টি দেশ আরো ৭ বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এ ১৭ বিলিয়ন ডলার বিশ্বব্যাংকের ‘গাজা পুনর্গঠন ও উন্নয়ন তহবিল’-এ জমা হওয়ার কথা ছিল।
যদিও জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, আগামী এক দশকে গাজা পুনর্গঠনে মোট ৭১ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ৭১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার প্রয়োজন। সে তুলনায় ১৭ বিলিয়ন ডলার মোট চাহিদার চার ভাগের এক ভাগও নয়।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্যানুযায়ী, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ অনুমোদিত স্বচ্ছ বিশ্বব্যাংক কাঠামোর পরিবর্তে বোর্ড অব পিস নিজস্ব উদ্যোগে জেপি মর্গান চেজ ব্যাংকে একটি বেসরকারি অ্যাকাউন্ট খোলে ও সেখানেই অনুদান গ্রহণ করে। বেসরকারি অ্যাকাউন্টে স্বাধীন কোনো জবাবদিহি বা স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে আন্তর্জাতিক মহলে বড় অংকের প্রতিশ্রুতির কথা প্রচার করা হলেও মূল ফান্ডটি সম্পূর্ণ শূন্য রয়েছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় প্রায় প্রতিদিন হামলা চালাচ্ছে। গত নয় মাসে হামলায় ১ হাজার ৫৩ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত ও ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি আহত হয়েছে। এছাড়া ইসরায়েল গাজায় সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখার সীমানা বাড়িয়ে মে ২০২৬ নাগাদ মোট ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশের বেশিতে নিয়ে গেছে, যা যুদ্ধবিরতির শুরুতে ৪৭-৫০ শতাংশ ছিল।
কূটনীতিকদের মতে, আশ্রয় শিবিরগুলোয় মানবিক পরিস্থিতি দিন দিন আরো ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক সংস্থা ওচার জুলাই ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার আশ্রয় শিবিরে মানুষের তীব্র ভিড়, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব ও প্রচণ্ড গরমের কারণে মাত্র দুই সপ্তাহে ৯ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি জলবসন্তে আক্রান্ত হয়েছে।
গাজার আল-শিফা হাসপাতালে প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) হিসাব অনুযায়ী, গাজার ৭৭ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ইসরায়েলি বিধিনিষেধের কারণে জাতিসংঘের অ্যাম্বুলেন্সগুলোও গাজায় প্রবেশ করতে পারছে না।