বছরওয়ারি হিসাবে এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ। স্থানীয় উদ্যোক্তারাও ব্যবসা পরিচালনায় এর প্রভাব টের পাচ্ছেন বেশ ভালোভাবেই। একদিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে অস্থিরতা, অন্যদিকে দেশে জ্বালানি তেলের দাম ও ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসা পরিচালনায় চাপ বেড়েছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের পরিচালন কার্যক্রমে আমদানি-রফতানি প্রভাবের একটি চিত্র আরো ভালোভাবে ফুটে উঠেছে।
গত ১০ বছরের কার্গো, কনটেইনার ও জাহাজের আগমন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল ১৭ লাখ ৯২ হাজার টিইইউস। ২০১৯ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে গড়ে ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে ধারাবাহিক এ প্রবৃদ্ধিকে ম্লান করে দিয়েছে ২০২২ ও ২০২৩ সাল। এ সময়ে প্রবৃদ্ধির বদলে উল্টো ঋণাত্মক চিত্রই দৃশ্যমান হয়েছে বন্দরে পণ্যের পরিচালন কার্যক্রমে।
আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে বড় পরিসরে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করেন এমন বেশ ক’জন শীর্ষ পর্যায়ের উদ্যোক্তা বণিক বার্তাকে জানান, প্রধানত ডলারের সংকট ও বিনিময় মূল্য বেড়ে যাওয়ার ফলে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মূল্যস্ফীতিতে স্থানীয় বাজারেও ভোক্তা চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। গত দুই বছরে টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের মূল্য বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ডলারের দাম ৮৬ টাকা থাকলেও সেটি এখন আনঅফিশিয়ালি ১২০ টাকার আশপাশে। এর পরও যারা আমদানি ধরে রাখতে চেয়েছেন, ব্যাংকগুলো বলছে তাদের কাছে ডলার নেই। আমদানি মূল্য মেটাতে না পারায় পণ্য নিয়ে বন্দরে জাহাজ আটকে থাকার ঘটনাও ঘটেছে।
বৃহৎ পরিসরে বন্দর ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপের (এমজিআই) চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলসি নিয়ে সমস্যা এখনো আছে, তবে সরকারও চেষ্টা করে যাচ্ছে। ব্যবসা পরিচালনায় ক্যাপিটাল অনেক বেশি লাগছে। আবার ক্যাশ ফ্লো কম। আন্তর্জাতিকভাবেও ব্যবসায়ীরা নানান প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছে। আমার এক লাখ টন গম আসার কথা আরো এক মাস আগে অথচ এখনো কোনো খবর নেই। আবার আমার নিজের একটা জাহাজ দেড় হাজার কিলোমিটার ঘুরে আসতে হচ্ছে শুধু লোহিত সাগরের সংকটের কারণে। সবকিছুর যোগফলই হলো ব্যবসা পরিচালনায় চলমান পরিস্থিতি, যেটা বন্দরের হ্যান্ডলিং কার্যক্রম ফলো করলেই আরো ভালোভাবে বোঝা যাবে।’
জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজারে সাপ্লাই যেমন কমেছে আবার ডিমান্ডও কমেছে। অন্তত ক্রেতার চাহিদা থাকলে পরিস্থিতি ইতিবাচক হতো। এছাড়া ক্যাশ ফ্লো যদি ভালো থাকে তাহলে সবকিছু ঠিকঠাক চলে। ইন্টারেস্ট ভালো পাওয়ায় বিভিন্ন ব্যাংক সরকারের ট্রেজারি বন্ডেই বেশি বিনিয়োগ করছে। এখন ব্যবসা পরিচালনায় ব্যাংক থেকে টাকার সংস্থান হওয়াটাও জরুরি। এমনিতে ডলারের প্রাইস বাড়ার কারণে টাকার ডিমান্ড বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। এটার ওপর কাস্টমসে ভ্যাট, ট্যাক্সও বেড়েছে।’
বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমীর আলী হুসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পিক সিজনে যেমনটা ব্যবসা হওয়া উচিত সেভাবে হয়নি। ব্যবসায় খরচ বেড়ে অভ্যন্তরীণ বাজারের পণ্যের দামও বেড়েছে। দেখা গেছে ইনভেন্ট্রি থাকলেও বাজারে চাহিদা নেই। এখন একটা মূল বিষয় হলো স্থানীয়ভাবে বাজারে চাহিদা বাড়াতে হবে। এলসি খোলা স্বাভাবিক করতে হবে।’
প্রিমিয়ার সিমেন্ট পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিলাসপণ্য আমদানি জরুরি নয়। এমন পণ্য আমদানিতে নিরুৎসাহিত করার বিষয়টি কাগজে-কলমে না রেখে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তবে বাজারে জরুরি খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামালের মতো পণ্যের জোগান ঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখারও বিকল্প নেই।’
ভোগ্যপণ্যের বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বাশার চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও মূল্যস্ফীতি হয়েছে কিন্তু তারা আবার কমিয়ে আনতেও পেরেছে সময়োপযোগী পদক্ষেপে। এদিকে ডলারের দাম বাড়ছে আর আমার প্রতিটি জিনিসের ওপর খরচ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে যে ভলিউমে টার্নওভার হয় সেটা কমে যায়, শিল্পের উৎপাদন কমে আসে। বন্দরের হ্যান্ডলিং কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই স্লো হয়ে আসে।’