চলমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট। এর প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিগুলো দ্রুত নবায়নযোগ্য ও স্বল্প কার্বনভিত্তিক জ্বালানিনীতির দিকে ঝুঁকছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাতের কারণে এ অঞ্চলের সরকারপ্রধানরা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে। সম্প্রতি প্রকাশিত যুক্তরাজ্যভিত্তিক জলবায়ু ও জ্বালানিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস’-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছয়টি প্রধান অর্থনীতি—ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে মোট ৩৭টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। বিপরীতে এ একই সময়ে জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পর্কিত নীতি নেয়া হয়েছে ২৯টি। সংস্থাটি জানায়, জীবাশ্ম জ্বালানিসংক্রান্ত পদক্ষেপগুলোর অধিকাংশই স্বল্পমেয়াদি এবং সাময়িক সংকট মোকাবেলার জন্য গৃহীত। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে নেয়া পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে তৈরি।
জ্বালানি গবেষকরা বলছেন, ভূরাজনৈতিক এ সংকট দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের ভাবনায় বড় পরিবর্তন এনেছে। এখন পরিচ্ছন্ন বা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরকে কেবল জলবায়ু সুরক্ষার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা থেকে নিজেকে রক্ষার কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ফিলিপাইন সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। দেশটি এরই মধ্যে ১৩টি স্বল্প-কার্বন নীতি চালু করেছে। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের সঙ্গে উন্নত জ্বালানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা যুক্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়া আগামী তিন বছরে ১০০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো সম্প্রতি প্রথম ধাপে ৫ দশমিক ৩ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ১৪টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকাজ শুরু করেছেন। বর্তমানে দেশটির মোট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ১ দশমিক ৫ গিগাওয়াট।
একইভাবে ভিয়েতনামে ৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন ও ১০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা সংরক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রথম বড় ব্যাটারি সিস্টেম চালু করা হয়েছে। ডেটা সেন্টার এবং বিদ্যুচ্চালিত যানবাহন (ইভি) চার্জিং স্টেশনগুলো যাতে সরাসরি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনতে পারে, সেজন্য নিয়ম সহজ করেছে দেশটি। থাইল্যান্ডও করপোরেট গ্রাহকদের জন্য জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে সরাসরি পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ তৈরি করেছে।
জিরো কার্বন অ্যানালিটিকসের জ্যেষ্ঠ জ্বালানি রূপান্তর গবেষক অ্যামি কং বলেন, ‘এ অঞ্চলের জ্বালানিনীতিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর পর দীর্ঘমেয়াদি পরিচ্ছন্ন জ্বালানির পরিকল্পনা বেড়েছে। এসব পরিকল্পনা এখন বাস্তব প্রকল্পেও রূপ নিতে শুরু করেছে।’
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কয়লা বা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর সাময়িক নির্ভরতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে রূপান্তর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। গ্রিড অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, ব্যাটারি স্টোরেজ প্রযুক্তি জোরদার ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করাই এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে সঠিক অবকাঠামো ও অর্থায়ন অপরিহার্য বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।