সামুদ্রিক মৎস্য খাত

বাণিজ্যিক জাহাজে মাছ আহরণ কিছুটা বাড়লেও ইলিশে ধস

দেশের সামুদ্রিক মৎস্য খাতে বাণিজ্যিক জাহাজে মাছ আহরণ বিগত তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি।

অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ইলিশ আহরণে বড় ধরনের ধস নেমেছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোট আহরণ কিছুটা বাড়লেও ইলিশসহ বিভিন্ন মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কাঙ্ক্ষিত আয় করতে পারছে না। একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রে আহরণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, মাছের মজুদ কমে যাওয়া, সরকারি নিষেধাজ্ঞা, ঝড়, সমুদ্রদূষণ, জেলিফিশের আধিক্য এবং নতুন বিনিয়োগের অভাব এ খাতের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭ টন সামুদ্রিক মাছ আহরণ হয়। পরের অর্থবছরে তা কমে ১ লাখ ১৪ হাজার ৮০৪ টনে নেমে আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আহরণ হয় ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৫০ টন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২৯ হাজার ৬৭৮ দশমিক ৩২৫ টনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আহরণ বেড়েছে ১৩ হাজার ২৮ টন বা ১১ দশমিক ১৭ শতাংশ। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের রেকর্ড আহরণের তুলনায় সর্বশেষ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৩৫৮ দশমিক ৬৭৫ টনে বা ১১ দশমিক ২০ শতাংশ।

অন্যদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাণিজ্যিক জাহাজে ৮ হাজার ১৩৮ টন সামুদ্রিক ইলিশ আহরণ হলেও বিদায়ী অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১ হাজার ৮২৩ টনে। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে আহরণ কমেছে ৬ হাজার ৩১৫ টন বা ৭৭ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ হাজার ৩৬৮ টন ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৯০ টন ইলিশ আহরণ হয়েছিল।

জানা যায়, দুই-তিন দশক আগেও দেশের সমুদ্র থেকে প্রায় ১২০ প্রজাতির মাছ আহরণ করা হতো, বর্তমানে তা ৫০টিতে নেমে এসেছে। ফলে সামুদ্রিক জলসীমা বড় হলেও মাছের বৈচিত্র্য ও প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইলিশের পাশাপাশি অন্যান্য প্রজাতির আহরণেও রয়েছে ওঠানামা। সর্বশেষ অর্থবছরে ৪০ হাজার ১৩৫ টনের বেশি সার্ডিন আহরণ করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় এ আহরণ বেড়েছে ১১ হাজার ৫৭১ টন বা ৪০ দশমিক ৫১ শতাংশ। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে সার্ডিন আহরণ হয়েছিল রেকর্ড ৫০ হাজার ৭৮৩ টন।

চিংড়ির আহরণও গত তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে কিছুটা বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টাইগার বা বাগদা, হোয়াইট বা চাদা/সাদা এবং ব্রাউন বা হরিণা জাতের চিংড়ি আহরণ হয় ৩ হাজার ৪৭৭ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২২ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চিংড়ির আহরণ বেড়েছে ৪৫৫ টন বা ১৫ শতাংশ। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেকর্ড ৫ হাজার ৬৪৬ টন ক্যাটফিশ আহরিত হলেও সর্বশেষ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ৩ হাজার ৫০৪ টন।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে চইক্যা ও বড় চইক্যা মাছ আহরিত হয়েছে ১৭ হাজার ৩৭৮ টন। এছাড়া পোয়া বা ভোলা ৪ হাজার ১৪০ টন, ছুরি ৬ হাজার ৩৩৮, দাতিনা ৪৬, আইলা ৫ হাজার ৩৩০, ষোল ২২৯, লাল কোরাল ২৬০, রূপচাঁদা ৮৪২, রূপবান ৫ হাজার ৮৯৪, বাইন ৩৩৮ ও হাঙর ১৪৭ টন আহরিত হয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন ধরনের টুনা, নারকেলী, স্কুইডসহ অন্যান্য সামুদ্রিক মাছও বাণিজ্যিক জাহাজে আহরণ করা হয়।

মৎস্য অধিদপ্তরের সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. ফারুক হোসাইন সাগর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ সর্বশেষ অর্থবছরে কিছুটা বেড়েছে। তবে যারা সমুদ্রে মাছ আহরণে যাবেন, তাদের মাছকে বড় হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। মাছের মজুদ বাড়াতে সব মাছ আহরণ করা ঠিক নয়। মাছ আহরণ হঠাৎ কমে বা বেড়ে যাওয়াও ভালো লক্ষণ নয়। তাই মাছ আহরণ স্থিতিশীল রাখা উচিত। মাছের মজুদের পরিমাণ জানা গেলে কতটুকু মাছ ধরা যাবে, সেটিও নির্ধারণ করা সম্ভব।’

সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ২৭০টি বাণিজ্যিক জাহাজ মাছ ধরার অনুমতি পেলেও নিয়মিত মাছ আহরণে যাচ্ছে ২৩২টি। বাকি ৩৮টি জাহাজ মালিকানা জটিলতা, অপারেশনাল ও আর্থিক সংকট, লোকবলসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে সমুদ্রে যেতে পারছে না। নিয়মিত যাওয়া ২৩২টি জাহাজের মধ্যে স্টিলের ১৭০টি ও কাঠের ৬২টি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কয়েকটি জাহাজ এক বা দুই ট্রিপ যাওয়ার পর আর্থিক সংকটের কারণে আর সমুদ্রে যেতে পারছে না। মৎস্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ৩০ হাজার ২২১টি বোটের তালিকা রয়েছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ ২৭০টি এবং ছোট নৌযান বা আর্টিশনাল বোট ২৯ হাজার ৯৫১টি। এ পর্যন্ত ২৫ হাজার ২৬৯টি নৌযানের নিবন্ধন হয়েছে। এসব নৌযানে মোট ২ লাখ ৭৩ হাজার ৮১৯ জন মানুষ কাজ করেন। তবে সমুদ্রে মাছ আহরণে ব্যবহৃত আর্টিশনাল বোটের প্রকৃত সংখ্যা ৬৮-৭০ হাজার বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

বাণিজ্যিক জাহাজসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামুদ্রিক এলাকা বড় হলেও সব জায়গায় মাছ আহরণ করা যায় না। মাছের প্রজাতিও অনেক কমে গেছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা, সমুদ্রে অস্থিরতা, ঝড়, জাহাজ মেরামত ও সমুদ্রদূষণের কারণে জেলিফিশের আধিক্য—সব মিলিয়ে বছরে সর্বোচ্চ ১৭০-১৮০ দিন মাছ আহরণ করা সম্ভব হয়।

তাদের ভাষ্য, বাণিজ্যিক জাহাজগুলো বর্তমানে প্রায় ২৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে মাছ আহরণ করে। এর বাইরে আরো গভীরে গিয়ে মাছ ধরার সক্ষমতা নেই। ফলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণের অধিকার থাকলেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

দেশে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক মাছ ধরার জাহাজের দৈর্ঘ্য ৪৭ মিটার। একটি জাহাজ একবার মাছ ধরতে গেলে জ্বালানি, খাবার, বেতনসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ ২৫ দিনে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু সমুদ্রে গিয়ে এখন আশানুরূপ মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত আয় করতে পারছেন না উদ্যোক্তারা। নতুন জাহাজ নির্মাণ ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি এ খাতে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও তা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এনাম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সমুদ্রে সর্বশেষ ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে গত দুই থেকে আড়াই মাসে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো মাত্র ১৪ দিন মাছ ধরতে পেরেছে। এছাড়া ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে জেলিফিশের আধিক্যের কারণে মাছ ধরা যায় না।’

তিনি বলেন, ‘বছরে বিভিন্ন কারণে তিন মাস সরকারি নিষেধাজ্ঞা, প্রায় দুই মাস ঝড় এবং অন্যান্য সমস্যা মিলিয়ে প্রায় ছয় মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকে। এর ওপর গত কয়েক বছরে সমুদ্রদূষণের কারণে জেলিফিশের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মাছের প্রাপ্যতাও কমেছে।’

একটি বাণিজ্যিক জাহাজ একবার মাছ ধরতে গেলে প্রায় এক মাসের প্রস্তুতি নিতে হয় এবং এতে বড় অংকের অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু সমুদ্রে যাওয়ার পর নানা সংকটের কারণে জাহাজগুলোকে ফিরে আসতে হচ্ছে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন উদ্যোক্তারা। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে মাছ আহরণ যে বেড়েছে, সেটি খুবই সামান্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এনাম চৌধুরী আরো বলেন, ‘এত বড় সমুদ্রের গভীরে গিয়ে মাছ আহরণের সক্ষমতা এখনো দেশের তৈরি হয়নি। তবে সমুদ্রে মাছ আহরণ বেড়ে যাওয়াও সব সময় ভালো নয়। সমুদ্রের মাছকে বড় হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এজন্য সমুদ্রদূষণ কমাতে কাজ করতে হবে, যাতে মাছের অভয়াশ্রমের কোনো ক্ষতি না হয়। অতিরিক্ত মাছ আহরণ করা যাবে না। পাশাপাশি অবৈধ নৌযানগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে। মাছের প্রজনন মৌসুম বিবেচনায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা দেয়ার সময়সীমা পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কিনা, সে বিষয়েও সরকারকে কাজ করতে হবে।’

আরও