ঋণ বৈষম্যই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রধান বাধা : কৃষি ব্যাংক চেয়ারম্যান

জালিয়াতি ও প্রতারণা এড়াতে অবিলম্বে একটি ন্যাশনাল কোল্যাটারাল রেজিস্ট্রি (জাতীয় বন্ধকী নিবন্ধন সংস্থা) এবং ফ্লোটিং অ্যাসেটের (চলমান সম্পদ) বিপরীতে অর্থায়নের ব্যবস্থা চালুর জোরালো দাবি জানান তিনি।

দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখনো তীব্র ঋণ বৈষম্য বিদ্যমান রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন। তিনি জানান, বর্তমানে দেশের ৮০ শতাংশের বেশি ঋণ সুবিধা পাচ্ছে বৃহৎ কর্পোরেট খাত, অথচ ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আজ সোমবার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অ্যা রাউন্ডটেবিল অন অ্যাকসেস টু ফাইন্যান্স ইন বাংলাদেশ: বিল্ডিং অ্যা মোর কন্ডুসিভ ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম ফর প্রাইভেট সেক্টর শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।

মোহাম্মদ নুরুল আমিন আরো বলেন, বৈষম্যের অন্যতম বড় কারণ হলো প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সরাসরি প্রবেশের সুযোগের অভাব। অনেক সময় পোশাক বা সামাজিক অবস্থানের কারণে এসি করা ব্যাংকে ঢুকতে মানুষ ইতস্তত বোধ করেন। কেবল ঋণের ক্ষেত্রেই নয়, আমানতকারীদেরও তাদের অর্থ সঠিক ও লাভজনক উপায়ে কোথায় বিনিয়োগ করবেন সে বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা ও ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসির অভাব রয়েছে।

প্রান্তিক পর্যায়, যেমন—ভাসমান দোকানদার, সবজি বিক্রেতা, ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক, সোশ্যাল মিডিয়া ভিত্তিক কনটেন্ট ক্রিয়েটর কিংবা ই-লার্নিং পরিচালনাকারীদের ব্যাংকিং আওতায় আনতে জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যবহারকে আরো বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বিদেশের সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড বা থাইল্যান্ডের উদাহরণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এনআইডিকে এমন একটি শক্তিশালী নথিতে রূপান্তর করা উচিত যা দিয়ে একজন মানুষের স্থায়ী ঠিকানা, স্থাবর সম্পদ বা ব্যবসার আইডেন্টিটি নিশ্চিত করে সহজেই লোন বা ফাইনান্সিং দেয়া সম্ভব হয়।

ব্যবসায়িক জটিলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে স্বল্পমেয়াদি (যেমন এক বছরের) ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, লাইসেন্স হাতে পেতেই ৯ মাস চলে যায়, যার মেয়াদ থাকে মাত্র ৩ মাস। সরকারের ট্যাক্স পলিসির মতো ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যবসার সনদগুলো দীর্ঘমেয়াদি (৩ থেকে ৫ বছর) করার আহ্বান জানান তিনি।

নুরুল আমিন উল্লেখ করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসএমই বিভাগের অধীনে ৯টি এবং কৃষি ও পল্লী ঋণ বিভাগের অধীনে ৩টি রিফাইন্যান্সিং স্কিম রয়েছে, যা প্রশংসনীয়। এমনকি উচ্চ সুদের হার যেন বাধা না হয়, সেজন্য এসব স্কিমের সুদ ৭ শতাংশের ওপরে রাখা হয়নি।

ব্যাংকিং খাতে নতুন পণ্য চালুর ওপর জোর দিয়ে তিনি ফ্যাক্টরিং বা ওয়ার্ক অর্ডারের বিপরীতে ইনভয়েস ফাইন্যান্সিং প্রথার গুরুত্ব তুলে ধরেন। কোনো কোল্যাটারাল বা জামানত ছাড়া কেবল মাল্টিন্যাশনাল বা বড় কোম্পানির ওয়ার্ক অর্ডারের ভিত্তিতে এ ধরনের ফাইন্যান্সিং দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

জালিয়াতি ও প্রতারণা এড়াতে অবিলম্বে একটি ন্যাশনাল কোল্যাটারাল রেজিস্ট্রি (জাতীয় বন্ধকী নিবন্ধন সংস্থা) এবং ফ্লোটিং অ্যাসেটের (চলমান সম্পদ) বিপরীতে অর্থায়নের ব্যবস্থা চালুর জোরালো দাবি জানান তিনি।

সংকট কাটাতে ব্যাংক ও অর্থায়ন ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন, এনবিএফআই ও ব্যাংকের জন্য যুগোপযোগী নীতির সংস্কার এবং গ্রাহক পর্যায় আর্থিক শিক্ষার বিস্তারের ওপর তাগিদ দিয়ে বক্তব্য শেষ করেন তিনি।

উক্ত গোলটেবিল আলোচনায় সরকারের নীতিপ্রণেতা, আর্থিক খাতের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী ও অর্থনীতিবিদরা অংশ নেন।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এমসিসিআইয়ের মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফারুক আহমেদ।

এতে আরো বক্তব্য দেন মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, পিডব্লিউসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও শাশা ডেনিমস, শাশা গার্মেন্টস এবং শাশা টেক্সটাইলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ, ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং হেড অব এসএমই ব্যাংকিং সৈয়দ আব্দুল মোমেন।

আরও