সরবরাহ সংকট

বৈশ্বিক এলএনজি চাহিদায় দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব পড়তে পারে

বিশ্বের এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে। এতে বৈশ্বিক গ্যাসের বাজারে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। সরবরাহ কমে যাওয়ায় এশিয়ায় এলএনজির দাম বেড়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের মতো রফতানিকারক দেশগুলো লাভবান হলেও দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের চাহিদা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো উচ্চ মূল্যের গ্যাসের বদলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

বিশ্বের এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। এর একটা বড় অংশ আসত কাতার থেকে। সংঘাতের কারণে এ সরবরাহে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে। ফলে এশিয়ার বাজারে এলএনজির প্রধান মূল্যসূচক জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) দ্রুত বেড়েছে।

জেকেএমে এলএনজির দাম বছরের শুরুতে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) ১০ ডলারের নিচে ছিল। গত মার্চে তা ২২ ডলারের ওপরে ওঠে। পরে কিছুটা কমলেও আবার বাড়তে শুরু করে। গত সপ্তাহে দাম ২৫ ডলারের ওপরে উঠে বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

গ্যাসের দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রফতানিকারকরা এখন বেশি আয় করছেন। দেশটির এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রফতানি প্রায় সর্বোচ্চ সক্ষমতার পর্যায়ে রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) দেশটির এলএনজি রফতানি বেড়েছে ২৩ শতাংশ।

এ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি খাতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বেশি দামের কারণে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমাচ্ছে। পাশাপাশি এসব দেশ সৌর ও বায়ুবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। ভারতে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ২৫ শতাংশ কমেছে।

থাইল্যান্ডও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটি ১০ লাখ পরিবারকে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল বসাতে সহায়তা করবে। এতে মোট পাঁচ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমানোই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

ভিয়েতনামের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘ভিনগ্রুপ’ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিকল্পনা বাতিল করেছে। প্রায় ৬৮০ কোটি ডলারের প্রকল্পটির বদলে কোম্পানিটি সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ এবং ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।

পাকিস্তানও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ৯০ শতাংশ পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আসবে পরিবেশবান্ধব উৎস থেকে। এক্ষেত্রে ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করতে পারে।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এশিয়ার এ পরিবর্তনের পেছনে ব্যাটারির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গত কয়েক বছরে বড় আকারের বিদ্যুৎ সঞ্চয়কারী ব্যাটারির দাম ব্যাপক হারে কমে গেছে। একই সঙ্গে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের খরচও কমেছে। ফলে অনেক দেশের কাছে এসব জ্বালানি গ্যাসের বিকল্প হিসেবে আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ডেটা সেন্টার বাড়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। তবে গ্যাস টারবাইনের সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিও নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক গ্যাস ইউনিয়ন দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক গ্যাসের চাহিদা বাড়ার আশা করছে। তবে হরমুজ সংকটের পর এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি পরিকল্পনায় পরিবর্তন এলএনজির ভবিষ্যৎ বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। উচ্চ মূল্য, সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও সস্তা নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার বিশ্বজুড়ে এলএনজির চাহিদা বৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিতে পারে বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন।

আরও