উদ্ভূত এ সংকটের কোনো ‘কুইক সলিউশন’ বা দ্রুত সমাধান নেই বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। অর্থনৈতিক বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন। সভায় আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, ড. হাবিবুর রহমান, জাকির হোসেন চৌধুরী, ড. কবির আহমেদ এবং মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ইস্যুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের চিন্তা ও মনোভাব জানতে চাইলে জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রভাবের ইঙ্গিত দেন গভর্নর। তিনি বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মধ্যপ্রাচ্য সফর করছেন, অন্য কোনোভাবে একটা সমাধান বের করা যায় কিনা। আসলে এ মুহূর্তে কোনো কুইক সলিউশন নেই। তাই প্রথমত, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দ্বিতীয়ত, ব্যয় কমিয়ে নিয়ে আসা দরকার।’
মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘সরকারের চেষ্টা আছে, দ্বিপক্ষীয় কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে কিছু করা যায় কিনা। যেমন নানা ধরনের উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করা। তবে দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প চিন্তা করতে হবে। কারণ আমরা এককভাবে একটা দেশের ওপরে যদি নির্ভরশীল থাকি, তাহলে তো সমস্যা বাড়তে পারে।’
এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, ‘আমরা আসলে সরকারকে নানান জিনিস দিচ্ছি, প্রভাব কী হতে পারে। রিজার্ভে কী প্রভাব হতে পারে। এগুলো প্রত্যেকটাই তো অনুমান। এ জিনিসগুলোই সরকারকে বলছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি, এর পুরোটার ওপরে যুদ্ধের প্রভাব পড়বে। আবার এমন নাও পড়তে পারে—যাদের সঙ্গে স্থির মূল্যে চুক্তি আছে। সেই চ্যানেলগুলো যদি উন্মুক্ত হয়ে যায়, তাহলে হয়তো অতটা প্রভাব পড়বে না।’
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে গভর্নর বলেন, ‘আমাদের একটু সতর্কতার সঙ্গে চলতে হবে। আসলে পরিস্থিতি প্রতিদিন পরিবর্তন হচ্ছে। হয়তো প্রতিদিন শব্দটা ঠিক হবে না। খানিক পরপরই পরিবর্তন হচ্ছে, আমরা দেখছি।’
মতবিনিময় সভায় সবার উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যদি আমরা গত পাঁচ-আট বছরের দিকে তাকাই, এ সমস্যাগুলো এখন “নিউ নরমাল” হয়ে গেছে। একদিন পর পর একটা সমস্যা আসবে।’
অর্থনৈতিক বিষয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকা উচিত নয় উল্লেখ করে গভর্নর বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি যাতে কোনো ধরনের পলিটিক্যাল ইন্টারেস্ট ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে না আসে। বারবার সহকর্মীদের বলছি, কারো কথাই আপনারা শুনবেন না। যদি সেই জায়গায় প্রয়োজন হয় আমি হয়তো আমার ঘাড়ে সেটা নিতে রাজি আছি।’
পাচার করা অর্থ উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায় প্রতিদিন বা একদিন পরপর বৈঠক করছি। আসলে চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারের সাফল্যের বৈশ্বিক হার খুব সামান্য। তারপরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। এটার জন্য সময়ও হয়তো কিছুটা লাগবে।’
কর-জিডিপি অনুপাত প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ‘এটা সবার জন্যই উদ্বেগজনক। বর্তমানে কর-জিডিপির অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে, এটা খুব একটা ভালো কিছু না। হ্যাঁ, এখানে আমাদের হয়তো কিছু ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা আছে। সেটা সমাধানের চেষ্টা করছি। আর অন্যদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যদি বাড়ে, তাহলে হয়তো আরেকটু ভালো ফল আমরা পাব।’
রাজস্ব বাড়াতে ও নোট ছাপানোর খরচ কমাতে নগদবিহীন লেনদেন প্রসারে বড় উদ্যোগ নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ‘৩০ জুনের মধ্যে দেশের প্রতিটি পেমেন্ট পয়েন্টে “বাংলা কিউআর” নিশ্চিত করা হবে। ১ জুলাই থেকে এটি এনফোর্স করা হবে। আর যারা বাংলা কিউআর ব্যবহার করবে না, তাদের জরিমানার আওতায় আনা হবে।’
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ‘এটা এমন একটা পর্যায়ে এসে আমরা পেয়েছি। এখানে আর পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। অতএব আমরা যেটা করছি এটার গতি বাড়াচ্ছি।’
বৃহৎ ঋণগ্রহীতা ও কর্মসংস্থান জোগানদাতাদের সঙ্গে সভা করা প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ‘শুরুতে বাণিজ্য সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসেছি। ঈদের পর অনেক বড় গ্রুপের সঙ্গে বসেছি, তাদের কোনো সমস্যা আছে কিনা তা জানার জন্য। যেখানে আমাদের সহযোগিতা দরকার, আমরা চেষ্টা করছি তাদের ফ্যাসিলিটেট করার।’
অর্থনীতির জন্য অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ‘আমরা আসলে কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দেব। এটা নিয়ে কাজ করছি। হয়তো অনেক কিছু সামনে পাওয়া যাবে। এসএমই খাত আরেকটা অগ্রাধিকার। আর তৃতীয় যেটা আনকনভেনশনাল হবে, সেটা হচ্ছে কিছু কারখানা বেশ আগেই বন্ধ ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও বেশকিছু বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের অগ্রাধিকার হবে, এখানে কীভাবে উৎপাদন শুরু করা যায়।’
সুদহার প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ‘এ মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি ধরে রাখার জন্য সুদহার খুব একটা কমানো যুক্তিসংগত হবে না। তারপরও নতুন বিনিয়োগের জন্য যে ধরনের ক্লাইমেট কনফিডেন্স আসা দরকার এত স্বল্প সময়ে আসবে না। কেউ যদি সিদ্ধান্ত নেয়, একটু সময় লাগবে। এজন্য কুইক ফিক্সিংয়ে যেতে চাই, সেটা হলো ওই ফ্যাসিলিটিজগুলো কত দ্রুত উৎপাদনে নিয়ে আসা যায়।’