দীর্ঘ ১৬ বছর আগের এক বিরোধের জেরে সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষায় কমিশন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্দেশ অনুযায়ী, আদেশ জারির ৩০ দিনের মধ্যে ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারী মো. গোলাম রহমানের ১২ লাখ ২০ হাজার টাকা বাধ্যতামূলকভাবে ফেরত দিতে হবে। এ সময়সীমার মধ্যে অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে ব্রোকারেজ হাউজটিকে ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা জরিমানা গুনতে হবে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।
বিএসইসির তথ্যানুসারে, আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারী মো. গোলাম রহমান ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই কাস্টমার কমপ্লেইন্ট অ্যাড্রেসাল মডিউলের মাধ্যমে কমিশনের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ২০১০ সালের ১৫ এপ্রিল তার অনুমতি ছাড়াই তার বিও অ্যাকাউন্ট থেকে ১২ লাখ ২০ হাজার টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন ও আত্মসাৎ করা হয়েছে। তার দাবি ছিল, এ টাকা তিনি সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে শেয়ার কেনার উদ্দেশ্যে দুটি চেকের মাধ্যমে জমা দিয়েছিলেন। গ্রাহকের দাবি অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছে বারবার মৌখিক তাগাদা দেন এবং ২০১৬ সালে (১৭ জানুয়ারি, ২৯ ফেব্রুয়ারি ও ১০ এপ্রিল) তিনটি লিখিত অভিযোগও জমা দেন, যা ব্রোকারেজ হাউজটি গ্রহণ করলেও কোনো সমাধান করেনি।
তবে আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেড এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করে। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর শুনানিতে অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, এ টাকা আত্মসাৎ করা হয়নি, বরং গ্রাহকের মৌখিক অনুরোধে জিএমজি এয়ারলাইনস লিমিটেডের আনলিস্টেড প্লেসমেন্ট শেয়ার কেনার জন্য তার অ্যাকাউন্ট থেকে আইল্যান্ডের ডিলার অ্যাকাউন্টে বুক ট্রান্সফার করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জিএমজি এয়ারলাইনস ১০ শতাংশ বোনাস শেয়ার দিলে গ্রাহকের শেয়ারের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ হাজার। আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ অভিযোগকারীকে এ কাগজের শেয়ার সার্টিফিকেট গ্রহণ করার প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের মতে, ২০১০ সালের ধসের পর জিএমজির আইপিও বাতিল হয়ে যাওয়া এবং ২০১৩ সালে ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর লোকসানের আশঙ্কায় তিনি এত বছর পর এ মিথ্যা মামলা করেছেন।
গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসি (ডিএসই) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তদন্তে আইল্যান্ড সিকিউরিটিজের বেশকিছু গুরুতর আইনি ও প্রক্রিয়াগত লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়। ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে এবং শুনানিতে কোম্পানির কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১২ লাখ ২০ হাজার টাকা উত্তোলনের জন্য তাদের কাছে কোনো লিখিত রিকুইজিশন স্লিপ বা লিখিত অনুমতিপত্র নেই; তারা সম্পূর্ণ মৌখিক নির্দেশের ভিত্তিতে এটি করেছিলেন। ২০১৬ সালে গ্রাহকের কাছ থেকে একাধিক লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরও তারা নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাছাড়া গ্রাহকের লেনদেনে স্বচ্ছতা বজায় না রাখা এবং তদন্ত দলকে বিভ্রান্তিকর বা অসমর্থিত তথ্য প্রদানেরও অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
সার্বিক তথ্যপ্রমাণ ও আইন পর্যালোচনার পর আইল্যান্ড সিকিউরিটিজের ব্যাখ্যা কমিশনের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়নি। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলার লক্ষ্যে বিএসইসি আদেশ জারির ৩০ দিনের মধ্যে আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ লিমিটেডকে মো. গোলাম রহমানের বিও অ্যাকাউন্ট থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে উত্তোলিত ১২ লাখ ২০ হাজার টাকা তাকে বাধ্যতামূলকভাবে ফেরতের নির্দেশ দিয়েছে। যদি ব্রোকারেজ হাউজটি নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়, তবে সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গের দায়ে তাদের ওপর ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা জরিমানা আরোপিত হবে। জরিমানা আরোপ করার ৩০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরবর্তী সাতদিনের মধ্যে ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে ওই জরিমানার টাকা বিএসইসির অনুকূলে জমা দিতে হবে। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পরবর্তী কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে বিএসইসি।