ব্যয় সংকোচন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই্) অটোমেশন বাড়াতে বিশ্বব্যাপী বড় কোম্পানিগুলো কর্মী ছাঁটাই বাড়িয়েছে। এ ছাঁটাই প্রবণতাকে আরো জোরালো করে তুলেছে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং ভোক্তা খাতে বিদ্যমান আস্থার ঘাটতি। রয়টার্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল চলতি অক্টোবরেই যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো এখন পর্যন্ত ২৫ হাজারেরও বেশি চাকরি ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শিপিং ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট খাতের জায়ান্ট কোম্পানি ইউপিএসের ৪৮ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের তথ্য এ হিসাবে ধরা হয়নি। কারণ তা ২০২৫ সালের শুরুতে কার্যকর হবে। চলতি অক্টোবরে ইউরোপে ছাঁটাইয়ের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে নেসলে একাই গত সপ্তাহে ১৬ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দ্বিতীয় দীর্ঘতম সরকারি শাটডাউনের কারণে দেশটিতে সামগ্রিম কর্মচ্যুতির পরিসংখ্যান প্রকাশ এখন স্থগিত রয়েছে। এ অবস্থায় এসব ছাঁটাইয়ের তথ্যে বাড়তি মনযোগ দিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রতি বছরের শেষ দিকে বড় কোম্পানিগুলো কিছু মাত্রায় ছাঁটাই করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো বাস্তবায়ন হয় ধাপে ধাপে।
নিউইয়র্কভিত্তিক ৫০ পার্ক ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী অ্যাডাম সারহানের ভাষ্যমতে, বিনিয়োগকারীরা এখন পুরো পরিস্থিতি নিয়ে অনেকটাই অন্ধকারে রয়েছেন। অ্যামাজনের মতো কোম্পানিগুলোর ছাঁটাই অর্থনীতিতে দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থনীতি শক্তিশালী হলে এ মাত্রায় গণছাঁটাই হয় না।
টার্গেট ও প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিকতায় বড় আকারের ছাঁটাই পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে অ্যামাজন। কোম্পানিটি অচিরেই ১৪ হাজার কর্মী ছাঁটাই করবে বলে জানিয়েছে। আর রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, এ সংখ্যা ৩০ হাজারেও পৌঁছতেও পারে।
শুধু অটোমেশন বা এআই খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি নয়, অন্যান্য কারণেও ছাঁটাই করছে বৃহৎ কোম্পানিগুলো। টার্গেট ও নেসলের নতুন প্রধান নির্বাহীরা নিজ নিজ কোম্পানির কার্যক্রম পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চমাত্রার আমদানি শুল্ক আরোপ শিশুদের জন্য পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান কার্টার’সকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে। এ অবস্থায় কোম্পানিটি জনবল সংকুচিত করেছে ১৫ শতাংশ।
হোয়াইট কলার বা অফিসভিত্তিক কর্মীরা এখন এআইকেন্দ্রীক অটোমেশনের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপদে রয়েছেন বলে বিভিন্ন সময়ে দাবি করা হচ্ছে। অ্যামাজন ও টার্গেটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের কর্মীদেরই ছাঁটাই করছে সবচেয়ে বেশি। অ্যামাজনের পদক্ষেপটিকে এখন বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এআই খাতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সার্থকতা প্রমাণে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
বৈশ্বিক হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিগ ফোর হিসেবে পরিচিত কোম্পানিগুলোর অন্যতম এবং ব্রিটিশ মাল্টিন্যাশনাল প্রফেশনাল সার্ভিস প্রতিষ্ঠান কেপিএমজির হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের এআই খাতে বিনিয়োগ পরিকল্পনার আকার গত প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তুলনায় এরই মধ্যে ১৪ শতাংশ বেড়ে গড়ে ১৩০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এআই খাতে বিনিয়োগ যে সত্যিই ব্যয় সংকোচন ও মুনাফা বাড়াচ্ছে; তা প্রমাণের জন্য কোম্পানির বোর্ড সদস্য ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ব্যাপক মাত্রায় চাপের মুখে থাকার কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৃহৎ কোম্পানিগুলোর ৭৮ শতাংশ নির্বাহী।
ব্যাংক অব আমেরিকার অর্থনীতিবিদরা গত ২২ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, এআই অটোমেশনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাবে এন্ট্রি-লেভেল জব বা কর্মীদের চাকরি শুরুর পর্যায়ের কাজে।
তবে বিষয়টিকে পুরোপুরি এআইয়ের প্রভাব বলতে রাজি নন ইনডিড হায়ারিং ল্যাবের অর্থনীতিবিদ অ্যালিসন শ্রীবাস্তব। তিনি বলেন, ‘আমি এখনই একে পুরোপুরি এআইয়ের প্রভাব বলতে চাই না। প্রযুক্তি খাত তার সর্বোচ্চে পৌঁছেছে ২০২২ সালে। এর পর থেকেই একটি ‘সংকোচন পর্ব’ চলছে। এআই অবশ্যই শ্রমবাজারে প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু এখনো তেমন তীব্র কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।’
চলমান শাটডাউনের কারণে মার্কিন শ্রমবাজার নিয়ে সরকারি তথ্য এখন সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। আর দেশটিতে দেয়াবেকার ভাতার সাপ্তাহিক তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে এখনো ছাঁটাইয়ের প্রবণতা সেভাবে বাড়েনি। তবে নতুন নিয়োগও বাড়ছে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মার্কিন শ্রমবাজার এখন একপ্রকার ‘লো-হায়ার, লো-ফায়ার’ (নিয়োগ কম, ছাঁটাইও কম) পরিস্থিতির মধ্যে আটকে আছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কোনো নিয়োগ না দিয়ে ধীরে ধীরে অনেকটা নিঃশব্দেই কর্মীসংখ্যা কমাচ্ছে। তবে ছাঁটাইয়ের গতি বাড়লে তা ভোক্তা আস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরো দুর্বল করতে পারে। দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার এখনো ফেডারেল রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রার ওপরে এবং শুল্কনীতির চাপও বিদ্যমান।
অ্যালিসন শ্রীবাস্তব বলেন, ‘আমার মতে এটি হলো এক ধরনের ‘শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা’। ‘লো-হায়ার, লো-ফায়ার’ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এখন নতুন এক ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। কোম্পানিগুলো এখন শুধু দেখার অপেক্ষায় রয়েছে, সামনের দিনগুলোয় আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে।’