রাজধানীর হাজারীবাগ

ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় চামড়া শিল্পের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা

রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকার অলিগলিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে কাঁচা চামড়াবোঝাই ভ্যানগাড়ি।

রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকার অলিগলিতে ঢুকতেই চোখে পড়ে কাঁচা চামড়াবোঝাই ভ্যানগাড়ি। গলির আশপাশে চামড়াত পণ্যের কারখানা। এর মধ্যে ‘নোয়াখালী ট্যানারি’ নামের একটি গলি ধরে ঢুকতেই চোখে পড়ে চারতলা একটি জীর্ণ ভবন। এর চারতলায় শাবাব লেদার্স ফ্যাক্টরি। এ কারখানার পণ্য রফতানি হয় নয়টি দেশে। কিন্তু জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের কারণে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েন কারখানার স্বত্বাধিকারী মাকসুদা খাতুন। এখনো সেই লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি। তবে চেষ্টা করছেন ঘুড়ে দাঁড়ানোর।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলার সময় মাকসুদার মতো একই পরিস্থিতির মুখে পড়েন হাজারীবাগের শত শত ব্যবসায়ী। সংকট কাটিয়ে এসব ব্যবসায়ী এখন পুরোদমে উৎপাদনে ফেরার চেষ্টা করছেন। তারা বলছেন, নতুন করে কোনো সংকট তৈরি না হলে এবং সহায়তা পেলে শিগগিরই তারা ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবেন।

মাকসুদা খাতুন প্রায় নয় বছর ধরে কারখানাটি চালাচ্ছেন। লোকবল অন্তত ৫৪ জন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দুই-তিন বছর ধরেই নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। এর মধ্যে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় দুই মাসের মতো কারখানা বন্ধ রাখতে হয়। এতে ব্যাপক ক্ষতি হয়। কভিড মহামারীতেও এতটা খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কারণ ওই সময় মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করত। কিন্তু এবার ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সেটাও সম্ভব ছিল না। তবে আমরা একটু একটু করে ফের ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছি। সময় লাগলেও এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠব বলে আশা করছি।’

হাজারীবাগের এসব কারখানায় জুতা, ব্যাগ, বেল্ট, জ্যাকেটসহ বিভিন্ন ধরনের চামড়াজাত পণ্য তৈরি হয়। বর্তমানে ক্লাস্টারটির অধীনে রয়েছে ৩৫০-৪০০টি দোকান, শোরুম ও চামড়াজাত পণ্যের কারখানা।

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পর এ এলাকায় পরিদর্শন শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা বেশ কিছুদিন আগে হাজারীবাগ ক্লাস্টারটি পরিদর্শনে যাই। চলমান সমস্যাগুলো নিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলি। তারা আমাদের কাছে নিজেদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। বর্তমানে তারা মূল যে সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, সেটি হলো অর্থায়ন। আমরা এরই মধ্যে গ্রাহক, ব্যাংক ও উৎপাদনকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছি। উদ্যোক্তাদের কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করছি।’

ক্লাস্টারটির অধীনে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা দেশের অভ্যন্তরেও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কাছে পণ্য সরবরাহ করে আসছে। হাজারীবাগ ক্লাস্টারের সভাপতি তানিয়া ওয়াহিব প্রায় ২০ বছর ধরে যুক্ত আছেন এ পেশায়। এপেক্স, বাটা, বে, আড়ংসহ শীর্ষস্থানীয় সাতটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছেন তিনি।

তানিয়া ওয়াহিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্বে চলমান নানা সংকটের কারণে আমদানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বর্তমানে ভোক্তাদের দেশীয় পণ্যে নির্ভরশীলতা বাড়ছে। তারা এখন বুঝতে পেরেছে আমাদের দেশেও মানসম্পন্ন পণ্য তৈরি হয়। এ কারণে আমাদের মতো স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।’

এসএমই ফাউন্ডেশনের আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে আমরা জোর দিচ্ছি প্রচারণার ওপর। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করতে যাচ্ছি। এতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসএমই উদ্যোক্তারা অংশগ্রহণ করবেন; নিজেদের পণ্য প্রদর্শন করবেন। বাইরের দেশ থেকেও ক্রেতারা আসবে। এ মাসের শেষে বা আগামী মাসের শুরুতে এ প্রদর্শনী হবে। তিন দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে উদ্যোক্তারা নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করার সুযোগ পাবেন।’

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, এলসি-সংক্রান্ত জটিলতা, ব্যাংক সুদহার বৃদ্ধিসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত চামড়া শিল্প খাত। তবে এর মধ্যেও নিজেদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তারা।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এসএমই খাতকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে প্রচার-প্রচারণা আরো বাড়াতে হবে। এছাড়া যেসব শ্রমিক চামড়াজাত পণ্য তৈরি করেন, তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

বিআরএম লেদার প্রডাক্টসের স্বত্বাধিকারী আলমগীর হোসেন বাদশা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগের তুলনায় পরিস্থিতি এখন সামান্য ভালো। আমরা আমাদের কারখানায় কর্মী সংখ্যা অনেক কমিয়ে এনেছি। কারণ ক্রয়াদেশ কমে এসছে। ছোটখাটো যেসব অর্ডার পাচ্ছি, সেগুলো নিয়েই বর্তমানে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’

আরও