আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত হচ্ছে সৌদি পুঁজিবাজার

জ্বালানি তেলের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতি বৈচিত্র্যায়নের পথে বড় একটি পদক্ষেপ নিল সৌদি আরব।

জ্বালানি তেলের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতি বৈচিত্র্যায়নের পথে বড় একটি পদক্ষেপ নিল সৌদি আরব। উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নে বিদেশ থেকে পুঁজির প্রবাহ আকর্ষণকে কৌশলগতভাবে অপরিহার্য মনে করছে দেশটি। এর আওতায় স্থানীয় পুঁজিবাজারকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টিকে নিছক পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণনীতি সংস্কার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি হতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম পুঁজিবাজারকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে আরো গভীরভাবে যুক্ত করার এক গেম চেঞ্জিং পদক্ষেপ। খবর দ্য ন্যাশনাল।

সৌদি আরবের ক্যাপিটাল মার্কেট অথরিটি (সিএমএ) জানিয়েছে, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশটির প্রধান পুঁজিবাজার তাদাউল সব ধরনের বিদেশী বিনিয়োগকারীর জন্য উন্মুক্ত হবে। ফলে প্রথমবারের মতো বিদেশীরা সরাসরি সৌদি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবেন। মূলত বিনিয়োগের পরিধি সম্প্রসারণ এবং বাজারের আরো আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে পদক্ষেপটি নিয়েছে সৌদি আরব।

সৌদি পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, সংশোধনীর মাধ্যমে মূল পুঁজিবাজারে প্রবেশের জন্য কোয়ালিফায়েড ফরেন ইনভেস্টর (কিউএফআই) ধারণাটি বাতিল করা হয়েছে। ফলে কোনো ধরনের যোগ্যতা পূরণের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই সব শ্রেণীর বিদেশী বিনিয়োগকারী সৌদি পুঁজিবাজারে প্রবেশ করতে পারবেন।

সিএমএ বোর্ডের সাম্প্রতিক বৈঠকের পর পুঁজিবাজারে বিদেশীদের জন্য উন্মুক্তকরণের ঘোষণাটি আসে। ওই বৈঠকে একাধিক সংশোধন এসেছে। এর অন্যতম হলো এখন থেকে বিদেশীদের বড় কোম্পানিগুলোর সূচক তাদাউলে সরাসরি বিনিয়োগের অনুমোদন দেয়া হবে। এতে মূল বাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য দুটোই বাড়বে। এতে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে তারল্যপ্রবাহ আরো শক্তিশালী হবে।

সৌদি নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) শেষ নাগাদ সৌদি পুঁজিবাজারে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানাধীন সম্পদের পরিমাণ ৫৯ হাজার কোটি সৌদি রিয়াল (প্রায় ১৫ হাজার ৭৩০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ) ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে মূল বাজারে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ দাঁড়ায় প্রায় ৫১ হাজার ৯০০ কোটি রিয়ালে, যা ২০২৪ সালের শেষে ছিল ৪৯ হাজার ৮০০ কোটি রিয়াল।

পুঁজিবাজারের নীতি সংস্কারের পদক্ষেপ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করছে সিএমএ। প্রায় ছয় মাস আগে প্রথমবারের মতো উপসাগরীয় দেশের বাসিন্দাদের জন্য শেয়ারবাজার খুলে দেয় সৌদি আরব। ওই সিদ্ধান্তের ফলে তারা সরাসরি সৌদি আরবের প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জ তাদাউলে বিনিয়োগের সুযোগ পান। এর আগে জুলাইয়ে সিএমএ জানায়, উপসাগরীয় দেশের বাসিন্দাদের জন্য তাদাউলে সরাসরি বিনিয়োগের অনুমতি দেয়া হবে। নতুন সংশোধনীতে এ নিয়মেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ব্যক্তি পর্যায়ের যেসব বিদেশী বিনিয়োগকারী আগে সৌদি আরব বা অন্য কোনো উপসাগরীয় দেশে বসবাস করতেন, তারা তাদের আবাসিক অনুমতি শেষ হয়ে গেলেও তাদাউলে তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ চালিয়ে যেতে পারবেন।

এর আগে ঋণ বাজার, অপেক্ষাকৃত ছোট কোম্পানির তালিকাভুক্ত বাজার নোমু, বিনিয়োগ তহবিল ও ডেরিভেটিভস বাজারে উপসাগরীয় বাসিন্দাদের সৌদি বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ ছিল।

সিএমএ জানিয়েছে, সর্বশেষ এ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো মূল পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণকারীদের আস্থা বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করা। অনুমোদিত সংশোধনীগুলো বাজার উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে সিএমএর ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি ভবিষ্যতে আরো পরিপূরক পদক্ষেপের পথ প্রশস্ত করবে, যাতে সৌদি পুঁজিবাজারকে একটি আন্তর্জাতিক বাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় এবং বিদেশী মূলধনের প্রবাহ বাড়ানো সম্ভব হয়।

বর্তমানে সৌদি পুঁজিবাজারের সম্মিলিত টার্নওভার ২ দশমিক ২৩ ট্রিলিয়ন ডলার। পুঁজিবাজার উন্নয়ন দেশটির সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম স্তম্ভ। গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিদেশী মালিকানার সীমা শিথিল করার পরিকল্পনার খবরে সৌদি শেয়ারবাজার ৫ দশমিক ১ শতাংশ বাড়ে, যা ছিল পাঁচ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে একদিনে সবচেয়ে বড় উত্থান।

সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ কর্মসূচির লক্ষ্য হলো, জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো, বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি জোরদার, নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও সৌদি নাগরিকদের বেকারত্ব হ্রাস। ২০১৬ সালে চালু হওয়া এ কর্মসূচির আওতায় সৌদি সরকার অবকাঠামো, রিয়েল এস্টেট ও পর্যটন খাতে বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করছে।

দেশটির ন্যাশনাল ডেট ম্যানেজমেন্ট সেন্টার জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার চলতি বছরে প্রথমবার ডলার বন্ড ইস্যু করে বাজার থেকে ১ হাজার ১৫০ কোটি ডলার সংগ্রহ করা হয়েছে। মূলত অর্থনীতির বৈচিত্র্যায়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এ বন্ড ইস্যুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কোম্পানি আইন, সিভিল লেনদেন আইনসহ একাধিক নতুন আইন প্রণয়ন করেছে সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে সৌদি অর্থনীতি প্রায় ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। এতে মূল ভূমিকা রাখবে জ্বালানি তেলের উত্তোলন বৃদ্ধি ও সংস্কারনির্ভর অভ্যন্তরীণ চাহিদা।

আরও