আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের অভিযোগ, কাস্টমসের উচ্চমূল্যে শুল্কায়ন, পরীক্ষার নামে প্রশাসনিক হয়রানি, অন্যান্য বন্দরের তুলনায় নীতিগত বৈষম্য এবং নানামুখী অসহযোগিতার কারণে হিলি দিয়ে শুল্কযুক্ত পণ্য আমদানি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এর প্রভাবেই বিদায়ী অর্থবছরে মোট ১ হাজার ৪৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৫৯৭ কোটি ৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ ৪৪৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বা ৪২ দশমিক ৮৯ শতাংশ। তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দাবি, এলসি (ঋণপত্র) খোলার হার কমে যাওয়া ও শুল্কমুক্ত পণ্যের আধিক্যের কারণেই বিশাল রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
হিলি স্থল শুল্ক স্টেশন সূত্রে জানা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ বন্দর থেকে মোট ১ হাজার ৪৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। এর মধ্যে অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৫৬ কোটি ২১ লাখ টাকার বিপরীতে আহরণ হয় ৩৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। আগস্টে ৫৬ কোটি ২১ লাখের বিপরীতে ৪৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, সেপ্টেম্বরে ৭২ কোটি ৮ লাখের বিপরীতে ৪৫ কোটি ৪৮ লাখ, অক্টোবরে ৯১ কোটি ৭১ লাখের বিপরীতে ৫৬ কোটি ৫৯ লাখ, নভেম্বরে ৫৩ কোটি ৯৬ লাখের বিপরীতে ৪২ কোটি ৯৯ লাখ এবং ডিসেম্বরে ৭৮ কোটি ২৫ লাখের বিপরীতে আহরণ হয় ৪৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
এছাড়া জানুয়ারিতে ৭১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪৪ কোটি ৯১ লাখ; ফেব্রুয়ারিতে ৯৫ কোটি ৯২ লাখের বিপরীতে ৫৬ কোটি ৮১ লাখ; মার্চে ১৩৮ কোটি ৮৬ লাখের বিপরীতে ৬১ কোটি ৩৯ লাখ; এপ্রিলে ৫১ কোটি ৪৫ লাখের বিপরীতে ৬৫ কোটি ২৯ লাখ; মে’তে ২০৩ কোটি ৩৮ লাখের বিপরীতে ৫৯ কোটি ৫৫ লাখ এবং অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ৭৫ কোটি ৮৪ লাখের বিপরীতে রাজস্ব আহরণ হয় ৩৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
হিলি স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট জাবেদ হোসেন রাসেলের মতে, উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য এ বন্দর দিয়ে আমদানি না হওয়াই রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম কারণ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা সরকারি সব নিয়মকানুন মেনে চললেও অন্যান্য বন্দরে তা মানা হচ্ছে না। ফলে সেসব বন্দর দিয়ে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে উচ্চশুল্কের পণ্য আমদানি হচ্ছে।’ এ অনিয়ম বন্ধ না করলে শুধু হিলি নয়, কোনো বন্দরেরই রাজস্ব ঘাটতি সরকার পূরণ করতে পারবে না বলেও দাবি তার।
হিলি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘এ বন্দরের কাস্টমসসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অজুহাতে দীর্ঘদিন ধরে আমদানিকারকদের হয়রানি, মনগড়া অ্যাসেসমেন্ট এবং ইচ্ছামতো মালামাল ল্যাব টেস্টে পাঠানোর মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে আমদানিকারকরা হিলি দিয়ে পণ্য আমদানিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।’ এছাড়া সড়কের বেহাল দশার কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ মোকামগুলোয় দ্রুত পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হয় না বলে দাবি করেন তিনি।
আমদানিকারক হযরত আলী সরদার জানান, বর্তমানে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে দিনে মাত্র ৫-১৫টির বেশি ট্রাক ঢুকছে না, ফলে সরকার নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘ছোটখাটো সাধারণ বিষয় নিয়েও ফাইল রংপুরে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে, যা অন্যান্য বন্দরে করা হয় না। শতভাগ শুল্ক পরিশোধ সত্ত্বেও কাস্টমসের এমন হয়রানির কারণে ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। ফলে আমদানিকারকরা এ বন্দর থেকে বিমুখ হয়ে অন্যান্য বন্দরে চলে যাচ্ছেন।’
হিলি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফেরদৌস রহমান দাবি করেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ও ভারতীয় ভিসা বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের যোগাযোগে বাধা এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাবে হিলি দিয়ে আমদানি-রফতানি স্থবির হয়ে পড়েছে। এছাড়া কমার্শিয়াল আইটেম না আসা, পর্যাপ্ত জায়গার অভাব, বর্ষায় লোড-আনলোডের ভোগান্তি ও বেহাল সড়কের কারণে বাণিজ্য কমেছে। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বন্দরের মতো পাথর, কয়লা ও ছাইয়ের মতো বাল্ক পণ্য শুল্ক দিয়ে নিজস্ব ইয়ার্ডে আনার সুযোগ দিলে ব্যবসা-বাণিজ্য আবারো বাড়বে’।
হিলি স্থল শুল্ক স্টেশনের সদ্যবিদায়ী ডেপুটি কমিশনার সন্তোষ সরেন মনে করেন, এলসি কমে যাওয়া এবং শুল্কমুক্ত (শূন্য রেটের) পণ্য বেশি আমদানি হওয়াই রাজস্ব ঘাটতির মূল কারণ। শুল্কযুক্ত পণ্য বেশি আমদানি হলে রাজস্ব বাড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কাস্টমসের পক্ষ থেকে কোনো গাফিলতি নেই, তারা সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন এবং একই দিনে কায়িক পরীক্ষা, শুল্কায়ন ও পণ্য ছাড়করণের সেবা দিচ্ছেন।’