চলতি অর্থবছর দেশে সাড়ে ৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস এডিবির

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ হার। সংস্থাটির মতে, জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, মুদ্রা বিনিময় হারের চাপ এবং খাদ্য ও সেবা খাতে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে প্রত্যাশার তুলনায় মূল্যস্ফীতি ধীরগতিতে কমবে। আগামী এক বছরে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ভারত ও ভুটানের চেয়ে কম।

গতকাল প্রকাশিত এডিবির এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক জুলাই সংস্করণে এ পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি দেশে পেট্রোলিয়াম, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রভাব পরিবহন, পরিষেবা ও অন্যান্য ভোক্তাপণ্যের দামে পড়বে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে নামতে পারে।

পূর্বাভাসে আরো বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ শতাংশ, যা গত এপ্রিলে দেয়া পূর্বাভাসের সঙ্গে অপরিবর্তিত। তবে আগামী বছরের এপ্রিলে গিয়ে তা নেমে আসবে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে এবং অর্থবছর শেষে ৮ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছতে পারে।

যদিও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ ছিল বলে তথ্য উঠে আসে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদনে। এদিকে চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ সরকার। পাশাপাশি ১০ শতাংশ নীতি সুদহার নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছ তথ্য নিশ্চিতের উদ্যোগও নিয়েছে সরকার।

এডিবি বলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং ব্যক্তিগত ভোগব্যয় সীমিত করছে। দুর্বল রফতানি ও আমদানির মাঝারি প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক চাহিদার দুর্বলতা ও বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরবরাহের দিক থেকে রফতানিমুখী উৎপাদন খাত উচ্চ জ্বালানি মূল্য, বৈদেশিক বাজারে দুর্বল চাহিদা এবং কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে চাপে থাকবে। অন্যদিকে সারের ঘাটতির কারণে কৃষি খাত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে রেমিট্যান্সনির্ভর পারিবারিক আয়ের কারণে সেবা খাত প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা সহায়তা করবে।

এডিবির আউটলুক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছর শেষে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম মূল্যস্ফীতি হবে ভারত, ভুটান ও মালদ্বীপের। এসব দেশে মূল্যস্ফীতি বর্তমানের চেয়ে কমে ৪ শতাংশ হবে। এছাড়া নেপালে ৫, শ্রীলংকায় ৫ দশমিক ২, আফগানিস্তানে ৫ দশমিক ৫ ও পাকিস্তানে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও কমতে পারে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার। এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হবে। সংশোধিত এ পূর্বাভাসে রফতানি খাতের দুর্বল কর্মদক্ষতা, বেসরকারি বিনিয়োগের মন্থর গতি, উচ্চ জ্বালানি মূল্য, অব্যাহত মূল্যস্ফীতির চাপ এবং প্রতিকূল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। যদিও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছে সরকার, যা এডিবির পূর্বাভাসের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি। বিবিএস প্রকাশিত গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জিডিপির সাময়িক হিসাবে প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়েছে।

এডিবি প্রতিবদন অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধির হারে ভারত ও ভুটানের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হবে ভারতের (৭ দশমিক ৩ শতাংশ)। এছাড়া ভুটানে ৭ দশমিক ২, বাংলাদেশ ও নেপালে ৪ দশমিক ৫, শ্রীলংকায় ৪, পাকিস্তানে ৩ দশমিক ৭ এবং মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে।

এডিবির বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাতসুনাগা বলেন, ‘কঠিন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও শক্তিশালী প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) প্রবাহ এবং সেবা খাতের স্থিতিশীল কার্যক্রমের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিস্থাপকতা প্রদর্শন করছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, আর্থিক খাতের সুশাসন বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে ধারাবাহিক সংস্কার জোরদার করা হলে আরো শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।’

আরও