দুর্লভ রত্নের সংকট বাড়াচ্ছে বিকল্প পাথরের চাহিদা ও মূল্য

একই সঙ্গে ক্রেতাদের পছন্দ ও রুচিতে পরিবর্তন আসায় বিকল্প রত্নপাথরের চাহিদা এবং দাম দুই-ই বাড়ছে।

বিশ্ববাজারে দুর্লভ প্রাকৃতিক রত্নপাথরের সরবরাহ কমে গেছে। এতে অলংকার সংগ্রাহক ও ব্যবসায়ীরা এখন বিকল্প রত্নপাথরের দিকে ঝুঁকছেন। একই সঙ্গে ক্রেতাদের পছন্দ ও রুচিতে পরিবর্তন আসায় বিকল্প রত্নপাথরের চাহিদা এবং দাম দুই-ই বাড়ছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে হীরা, চুনি, পান্না, নীলা ও মুক্তা গহনার বাজারে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুর্লভ প্রাকৃতিক রত্ন। তবে খনি বন্ধ হয়ে যাওয়া, মজুদ কমে আসা, খননে বিধিনিষেধ এবং ভূরাজনৈতিক কারণে এসব রত্নের জোগান ও সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে যাচ্ছে। একই সময়ে ক্রেতাদের পছন্দেও পরিবর্তন এসেছে। এ কারণে পারাইবা ট্যুরমালাইন, স্পিনেল, গার্নেট, কুনজাইট, পেরিডট, তানজানাইট ও আনহিটেড স্যাফায়ারের মতো তুলনামূলক কম পরিচিত রত্নের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। রত্নবিশেষজ্ঞ জোয়ানা হার্ডি বলেন, ‘গহনা তৈরিতে প্রায় ৫০ ধরনের রত্নপাথর ব্যবহার করা হয়। অলংকার শিল্পে এখন আর ঐতিহ্যবাহী রত্নের বাইরের পাথরগুলোকে কম মূল্যবান বা সেমি-প্রেশাস হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না। কোনো রত্নপাথর যদি টেকসই, সুন্দর ও দুর্লভ হয়, তবে তা এখন মূল্যবান পাথর হিসেবেই গণ্য হচ্ছে।’

পারাইবা ট্যুরমালাইনের বাজারে এ পরিবর্তন স্পষ্ট। গত বছর এ রত্নের দাম সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ২০২৫ সালে নিউইয়র্কে ক্রিস্টির নিলামে একটি প্যারাইবা টুরমালিন প্রতি ক্যারেট ৩ লাখ ১১ হাজার ডলারে বিক্রি হয়।

সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙের প্যারাইবার সরবরাহ সীমিত। ব্রাজিলের বাতালহা খনি ২০১৬ সালে অবৈধ খননের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পর বন্ধ হয়ে যায়। মোজাম্বিক ও নাইজেরিয়ায় এখনো কিছু মজুদ থেকে পাথর তোলা হচ্ছে। তবে সেখানে কাজের পরিমাণ তুলনামূলক কম।

স্পিনেলের দামও বেড়েছে। গত এক দশকে এ রত্নের দাম বছরে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বিশেষ করে লাল ও কোবাল্ট-নীল স্পিনেলের চাহিদা বেশি। ২০১৯ সালে বনহামসের নিলামে একটি বড় ও বিরল স্পিনেল ২ লাখ ৭৫ হাজার ডলারে বিক্রি হয়।

প্রাকৃতিক মুক্তার সরবরাহও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে চাপের মুখে পড়েছে। প্রাকৃতিক মুক্তার জন্য পরিষ্কার পানি ও সুস্থ ঝিনুকের প্রয়োজন। স্কটল্যান্ডে ১৯৯৮ সাল থেকে মুক্তার জন্য ঝিনুক সংগ্রহ নিষিদ্ধ। ঐতিহ্যবাহী ক্রিম রঙের প্রাকৃতিক মুক্তার ঘাটতি থাকায় এখন গোলাপি, রুপালি ও হালকা বেগুনি রঙের মুক্তার প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে।

হীরার বাজারেও সরবরাহ কমছে, বিশেষ করে দুর্লভ রঙের হীরার ক্ষেত্রে। অস্ট্রেলিয়ার আর্গাইল খনি ২০২০ সালে বন্ধ হয়ে যায়। একসময় বিশ্বের গোলাপি হীরার প্রায় ৯০ শতাংশ এ খনি থেকে আসত। এছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে দুর্লভ লাল হীরার পরিমাণও খুবই সীমিত। এক ক্যারেটের বেশি ওজনের লাল হীরা পুরো বিশ্বে ৩০টির মতো রয়েছে।

কিম্বারলি প্রসেসের ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, ২০০৫ সালে বিশ্বে অপরিশোধিত হীরা উৎপাদন হয়েছিল ১৭ কোটি ৬৭ লাখ ক্যারেট। ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৯ কোটি ৮৮ লাখ ক্যারেটে। অর্থাৎ দুই দশকে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪৪ শতাংশ।

ফ্যাশন, নকশা, পাথরের উৎস ও সংগ্রাহকদের আগ্রহও দামে বড় প্রভাব ফেলে। ফলে গহনার বাজারে কৃত্রিম বা ল্যাব-গ্রোন হীরার অংশীদারত্ব বেশি থাকলেও দুর্লভ ও প্রাকৃতিকভাবে রঙিন হীরার আবেদন সংগ্রাহকদের কাছে আগের মতোই অটুট রয়েছে।

আরও