কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন

আমদানি নীতিতে বড় ছাড়, বাড়ছে বাণিজ্য অর্থায়নের সুযোগও

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করতে আমদানি অর্থায়নে বড় ধরনের নীতিসহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আমদানি-সংক্রান্ত আগের বিভিন্ন নির্দেশনা একীভূত ও হালনাগাদ করে জারি করা নতুন সংকলিত প্রজ্ঞাপনে এলসি ছাড়াই আমদানি, দীর্ঘমেয়াদি বাকিতে কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি, সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স, ডিজিটাল বাণিজ্য নথি এবং ফ্রি ট্রেড জোনে (এফটিজেড) আমদানির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার সুদহার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ফরওয়ার্ড রেট এগ্রিমেন্টের (এফআরএ) সুযোগও দেয়া হয়েছে।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে ২০২৫ সালের ১৪ আগস্টের আমদানি-সংক্রান্ত সংকলিত প্রজ্ঞাপন এবং পরবর্তী সময়ে জারি করা নির্দেশনাগুলো একত্র করা হয়েছে। নতুন প্রজ্ঞাপন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে আগের সংকলিত প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের গাইডলাইনস ভলিউম-২-এর রিপোর্টিং-সংক্রান্ত নির্দেশনা বহাল থাকবে। প্রজ্ঞাপনটি এক বছর কার্যকর থাকবে।

নতুন নীতিমালার অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো এলসি-নির্ভরতার বাইরে আমদানি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো। নির্ধারিত শর্তে ডকুমেন্টারি কালেকশনের আওতায় ডকুমেন্টস এগেইনস্ট পেমেন্ট (ডিপি) ও ডকুমেন্টস এগেইনস্ট অ্যাকসেপ্টেন্স (ডিএ) পদ্ধতিতে আমদানি করা যাবে। ক্রয় বা বিক্রয় চুক্তির আওতায় এলসি ছাড়াও আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। বাণিজ্যিক আমদানিতে নির্ধারিত সীমার মধ্যে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের ইউজেন্স বা বিলম্বিত পরিশোধের সুবিধাও দেয়া হয়েছে।

শিল্প খাতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা এসেছে কাঁচামাল আমদানিতে। নিজস্ব ব্যবহারের জন্য কাঁচামাল আমদানিতে সর্বোচ্চ ২৭০ দিনের ইউজেন্স সুবিধা দেয়া হয়েছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ক্যাশ কনভার্সন সাইকেল এর চেয়ে কম হলে সেই সময়সীমাই প্রযোজ্য হবে। কৃষি যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক সার আমদানিতেও ২৭০ দিনের ইউজেন্স সুবিধা রাখা হয়েছে। স্পেয়ার পার্টস, জাহাজ স্ক্র্যাপিংয়ের জন্য জাহাজ, এপিআই ও ল্যাবরেটরি রিএজেন্টসহ কয়েকটি পণ্যে সর্বোচ্চ ৩৬০ দিন এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও কিছু মেডিকেল সরঞ্জামে ১৮০ দিন পর্যন্ত বাকিতে আমদানির সুযোগ রয়েছে।

মূলধনি যন্ত্রপাতি ও মূলধনি পণ্য আমদানিতে সর্বোচ্চ তিন বছর মেয়াদি ইউজেন্স সুবিধা দেয়া হয়েছে। ইপিজেড, প্রাইভেট ইপিজেড, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কসহ সরকারি ঘোষিত বিশেষায়িত অঞ্চলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানও এ সুবিধা পাবে। এতে আমদানির সময় এককালীন অর্থ পরিশোধের চাপ কমার পাশাপাশি শিল্পের কার্যকরী মূলধন ব্যবস্থাপনাও সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আমদানির আগাম অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রেও কিছুটা ছাড় দেয়া হয়েছে। গ্রহণযোগ্য ব্যাংক গ্যারান্টি থাকলে নির্ধারিত শর্তে আগাম অর্থ পরিশোধ করা যাবে। ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত আগাম পরিশোধে রিপেমেন্ট গ্যারান্টির প্রয়োজন হবে না। জরুরি ক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমার বেশি আগাম অর্থ পরিশোধের অনুমোদনের আবেদনও করা যাবে।

সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বায়ার্স ক্রেডিট, সাপ্লায়ার্স ফাইন্যান্সিং ও পে-এবলস ফাইন্যান্সিংয়ের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে আমদানি অর্থায়নের বিকল্প বাড়ানোর সুযোগ দেয়া হয়েছে। এতে আমদানিকারকের পাশাপাশি বিদেশী সরবরাহকারীরও দ্রুত অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ তৈরি হবে।

এদিকে এফটিজেডে আমদানি বাণিজ্যের জন্য পৃথক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এফটিজেডের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনুমোদিত ট্রেডার ও লজিস্টিকস সেবা প্রদানকারীরাও আমদানি করতে পারবে। কনসাইনমেন্ট ভিত্তিতে আমদানি করা পণ্য নির্দিষ্ট শর্তে ৪৮-৬০ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

বাণিজ্যের ডিজিটাল রূপান্তরেও নতুন নীতিমালায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট শর্তে ইনভয়েস, পরিবহন নথি ও অন্যান্য বাণিজ্যিক দলিল ইলেকট্রনিকভাবে গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। অনুমোদিত বাণিজ্য করিডোরে ডিজিটাল ট্রেড ডকুমেন্টের পাইলট কার্যক্রম চালুর সুযোগও দেয়া হয়েছে। ইলেকট্রনিক বিল অব লেডিং, বাণিজ্যিক ইনভয়েস ও বিল অব এক্সচেঞ্জ এ ব্যবস্থার আওতায় আসবে।

আরও