বিলাসবহুল গহনার বাজারে নকশা ও উপকরণের পাশাপাশি গুরুত্ব বাড়ছে ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের। এক্ষেত্রে জাপানের প্রাচীন কারুশিল্পের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অলংকার নির্মাতারা। তারা শুধু জাপানি নকশা থেকে অনুপ্রেরণা নিচ্ছেন না, বরং দেশটির দক্ষ কারিগরদের সঙ্গে কাজ করে তাদের বিশেষ নির্মাণকৌশলও রপ্ত করছেন।
ব্রাজিলের গহনা নির্মাতা সিলভিয়া ফুরমানোভিচের কাজ এর একটি উদাহরণ। গত সেপ্টেম্বরে ইতালির ভেনিসে অনুষ্ঠিত হোমো ফ্যাবার কারুশিল্প প্রদর্শনীতে তিনি জাপানি ল্যাকার বা বার্নিশ শিল্পের কারিগর ওনিহিরা কেইজির সঙ্গে তৈরি একটি ফড়িং আকৃতির ব্রেসলেট উপস্থাপন করেন। এতে ব্যবহার হয়েছে জাপানের ঐতিহ্যবাহী বার্নিশের কাজ, স্বর্ণ ও রুপার গুঁড়া দিয়ে নকশা তৈরির কৌশল ও ঝিনুকের খোলস বসিয়ে অলংকরণের পদ্ধতি।
ব্রিটিশ বিলাসপণ্য নির্মাতা অ্যাসপ্রের জন্য নতুন গহনার সংগ্রহেও জাপানি কারুশিল্প ব্যবহার করছেন ফুরমানোভিচ। এতে রয়েছে অ্যাসপ্রের দুর্লভ রঙিন জেড পাথর। সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে জাপানি বাঁশ, পুনর্ব্যবহৃত অ্যামাজনীয় কাঠ, ঘোড়ার লোম দিয়ে তৈরি বুনন ও বিভিন্ন উপকরণ খোদাই করে বসানোর ঐতিহ্যবাহী জাপানি কৌশল শিবায়ামা।
জাপানের কারুশিল্পের ব্যবহার দেখা গেছে ফরাসি বিলাসবহুল গহনা নির্মাতা ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আর্পেলসেও। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি ‘ল্যাকারড বাটারফ্লাইজ’ সংগ্রহে যুক্ত করেছে নতুন কিছু গহনা। এ সংগ্রহের জন্য দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে জাপানি বার্নিশ শিল্পী জুনিচি হাকোসের সঙ্গে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রজাপতির ডানায় থাকা রঙের বৈচিত্র্য গহনায় ফুটিয়ে তুলতে ২০০৪ সালে বার্নিশ ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আর্পেলস। ফ্রান্সে তৈরি স্বর্ণ, ঝিনুকের খোলস ও হীরার গহনা পরে পাঠানো হয় জাপানে। সেখানে হাকোসে নিজের নকশা ও কারিগরি দক্ষতা দিয়ে প্রজাপতির ডানায় বার্নিশের কাজ করেন। প্রতিটি ডানায় প্রায় ১০টি স্তরে বার্নিশ লাগানো হয়। প্রতিটি স্তরের পর তা শুকানো ও ঘষে মসৃণ করার কাজ চলে। এরপর প্রয়োগ করা হয় ঐতিহ্যবাহী বার্নিশের কৌশল কিংবা কোয়েলের ডিমের খোসা দিয়ে নকশা তৈরির পদ্ধতি।
ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আর্পেলসের প্রধান নির্বাহী ক্যাথরিন রেনিয়ের বলেন, ‘জাপানের শিল্প ও নকশার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সম্পর্ক প্রায় এক শতাব্দীর। শুরুতে জাপানি শিল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ছোট বাক্স ও ব্যক্তিগত সামগ্রীতে নকশা করা হতো। ১৯৭০ সালে ওসাকায় বিশ্ব প্রদর্শনীর পর এ প্রভাব আরো বাড়ে। ১৯৭৩ সালে জাপানে কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।’ জাপানি ঐতিহ্য শুধু গহনা তৈরির কৌশলেই সীমাবদ্ধ নেই। পুরনো উপকরণ সংরক্ষণ ও মেরামতের ধারণাও আকর্ষণ করছে নির্মাতাদের। এর উদাহরণ ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক নকশাকার কেটি ব্রুনিনির প্রতিষ্ঠান কে ব্রুনিনি। তার ‘এইজিউস বল্ডউইন’ সংগ্রহে ব্যবহার করা হয়েছে পুরনো জাপানি পোশাকের কাপড় ও কিনৎসুগি নামের ঐতিহ্যবাহী মেরামত পদ্ধতি।
কিনৎসুগিতে ভাঙা মাটির পাত্র বার্নিশ ও মূল্যবান ধাতুর গুঁড়া দিয়ে জোড়া লাগানো হয়। এতে ভাঙা অংশ লুকিয়ে ফেলার বদলে সেটিকে নকশার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়। ব্রুনিনি একই ধারণা ব্যবহার করেছেন পুরনো কাপড়ের ক্ষেত্রে।
নিউইয়র্কভিত্তিক গহনা ব্র্যান্ড মিলামোরের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ইনাকির কাজেও জাপানি ঐতিহ্যের প্রভাব রয়েছে। তিনি নকশা করেন নিউইয়র্কে, আর তার ব্র্যান্ডের মূল্যবান গহনা তৈরি হয় জাপানে। চলতি বছর তিনি ফিলিপাইনে জন্ম নেয়া প্রথম জাপানি ডিজাইনার হিসেবে সিএফডিএ/ভোগ ফ্যাশন ফান্ডের চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন।
মিলামোরের নকশায় কিনৎসুগি এখন একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। ভাঙা পাত্র জোড়া লাগানোর পর যে সোনালি রেখা তৈরি হয়, গহনায়ও সে রেখার অনুকরণ করা হয়। ইনাকির কাছে এটি শুধু নকশার কৌশল নয়, বরং জীবনের অভিজ্ঞতাকে স্বীকার করার একটি দর্শন।
ইনাকির মতে, জাপানি কারুশিল্পের বিশেষত্ব শুধু কোনো নির্দিষ্ট নকশা বা নির্মাণকৌশলে নয়। এর পেছনে রয়েছে কাজের প্রতি নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও উপকরণ ও প্রক্রিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। জাপানের কারিগরদের কাজের সরঞ্জাম ব্যবহারের ধরনও তাকে প্রভাবিত করে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে