পানির স্তর নামার কারণে পানামা খালেও জাহাজ চলাচলে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। ফলে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ জলপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খবর দি এজ মালয়েশিয়া।
শিপিং এজেন্ট নর্টন লিলির তথ্য অনুযায়ী, পানামা খাল কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে জাহাজের কিছু বুকিং স্লট স্থগিত করছে। মূলত আবহাওয়াসংক্রান্ত পরিবর্তন ও সম্ভাব্য ‘এল নিনো’র প্রভাবের কারণে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এল নিনোর প্রভাবে এলাকায় বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় খালে প্রয়োজনীয় পানির তীব্র সংকট তৈরি হতে পারে।
পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত ২৫ জুলাই থেকে ‘পানাম্যাক্স’ শ্রেণীর জাহাজের জন্য দৈনিক নিলামভিত্তিক বুকিং বন্ধ থাকবে। ফলে প্রতিদিন খাল দিয়ে চলাচলের অনুমোদন পাওয়া জাহাজের সংখ্যা ৩৬ থেকে কমে ৩৪-এ নেমে আসবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে খাল ব্যবহারের সুযোগ আরো সীমিত হবে। আগে থেকে বুকিং না থাকা জাহাজগুলো বেশি বিপাকে পড়বে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের বুকিং পেতে প্রতিযোগিতাও বাড়বে।
এমন সময় এ সিদ্ধান্ত এল, যখন বিশ্বের আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেও অস্থিরতা চলছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে আছে প্রায় পাঁচ মাস ধরে। অন্যদিকে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর হুমকির কারণে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রুটে একসঙ্গে চাপ তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন বলছে, পানামা খালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ গাতুন হ্রদের পানির উচ্চতা এরই মধ্যে কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে এর পানির গভীরতা ৮৪ দশমিক ৬ ফুট। এটি পাঁচ বছরের গড় হিসাবের চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৪ ফুট কম। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ পানির উচ্চতা আরো কমে ৮৩ দশমিক ৮ ফুটে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
এর আগে ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময়ও পানামা খালে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছিল। তখন দৈনিক জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। ওয়েদারনিউজ ইনকরপোরেটেডের তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে যেখানে মাসিক ১ হাজার ৫২৩ জাহাজ চলাচল করেছিল, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ১ হাজার ৫৪টিতে নেমে আসে।
আবহাওয়া পূর্বাভাস সংস্থাগুলোর মতে, চলতি বছরের এল নিনো গত ৭৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। ফলস্বরূপ মধ্য যুক্তরাষ্ট্রে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে গত সাত সপ্তাহে পানামায় স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টি হয়েছে।
ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পানামা খালসংলগ্ন এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা অন্তত ৭০ শতাংশ। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় পানামা খাল কর্তৃপক্ষ প্রস্তুতি জোরদার করেছে।
গত জুনে কর্তৃপক্ষ জানায়, চরম আবহাওয়া মোকাবেলা করতে পূর্বপ্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। তিন বছর আগে জলপথে যেভাবে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, এবার যেন তেমনটি না ঘটে, সে লক্ষ্যে বিশেষ পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি পানামা খালে চলাচল সীমিত হলে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় দুটিই বাড়বে। এর প্রভাব বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা, জাহাজ ভাড়া ও বিভিন্ন পণ্যের দামের ওপরও পড়তে পারে।