যুক্তরাষ্ট্রের কার্বন নিঃসরণে তিন দশকে বৈশ্বিক ক্ষতি ১০ ট্রিলিয়ন ডলার

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির জন্য একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি দায়ী যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৯০ সাল থেকে তিন দশকে দেশটির মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় ১০ লাখ কোটি (১০ ট্রিলিয়ন) ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রবন্ধে এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিশাল অংকের এ অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশ খোদ যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরই হয়েছে। তবে মার্কিন নিঃসরণের ফলে সৃষ্ট সংকটের বোঝা সবচেয়ে বেশি বইতে হচ্ছে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোকে। জলবায়ু পরিবর্তনের এ প্রভাবকে গবেষকরা ‘তিল তিল করে মৃত্যু’ বা ‘ডেথ বাই আ থাউজ্যান্ড কাটস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিহাসের বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি ক্ষতি করেছে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন। বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ হলেও ১৯৯০ সাল থেকে বৈশ্বিক জিডিপিতে চীনের কারণে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯ লাখ কোটি ডলার।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী মার্শাল বার্ক বলেন, ‘এগুলো অত্যন্ত বড় অংকের সংখ্যা। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এ ক্ষয়ক্ষতির বিশাল দায়ভার বর্তায়। মার্কিন নিঃসরণ কেবল তাদের নিজেদেরই ক্ষতি করেনি, বরং বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করেছে।’

তথ্যানুযায়ী, ১৯৯০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কার্বন নিঃসরণের ফলে ভারতের অর্থনীতিতে আনুমানিক ৫০ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। একইভাবে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল প্রায় ৩৩ হাজার কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

গবেষণাটিতে মূলত ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ‘ক্ষয়ক্ষতি’ বিষয়টিকে আর্থিক মূল্যে পরিমাপ করার চেষ্টা করা হয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বাড়ায় সমাজ ও অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তাই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ ও শস্যহানির মতো দুর্যোগগুলো আরো ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, যা সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

মার্শাল বার্ক জানান, তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও মানুষের কাজের গতি ও প্রবৃদ্ধি কমে যায়। যদি ৩০ বছর ধরে এ প্রভাব জমতে থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি বিশাল এক নেতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে।

তিনি বলেন, ‘অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণে এমন কিছু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যারা এ সমস্যার জন্য দায়ী নয়।’

কলম্বিয়া বিজনেস স্কুলের জলবায়ু অর্থনীতিবিদ গের্নট ওয়াগনার বলেন, ‘অতীতে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করা হয়েছে, তা বায়ুমণ্ডলে জমা হয়ে ক্রমাগত তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে এবং ক্ষতি করছে। আমরা যদি এ ক্ষতির আর্থিক দায়ভার এখনই গ্রহণ করি এবং নিঃসরণ কমাতে বিনিয়োগ করি, তবে তা ভবিষ্যতে আমাদের অনেক বড় বিপর্যয় থেকে বাঁচাবে।’

তবে জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট ক্ষতির জন্য দায়ী থাকার বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরেই অস্বীকার করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে এ প্রবণতা আরো প্রকট হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রকাশিত প্রতিবেদনে।

ট্রাম্প প্রশাসন জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তার জন্য গঠিত ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছে এবং বৈশ্বিক সব জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে। এছাড়া ট্রাম্প ‘ড্রিল, বেবি, ড্রিল’ স্লোগান দিয়ে তেল ও গ্যাস উত্তোলনে উৎসাহিত করছেন এবং স্থানীয় ক্লিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব শক্তি প্রকল্পকেও বাধাগ্রস্ত করার জন্য নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার জলবায়ু সংকটবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফ্রান্সেস মুর এ গবেষণাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করলেও একটি সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন। তার মতে, দরিদ্র দেশগুলোর ওপর ক্ষতির প্রকৃত বোঝা হয়তো এ অংকের চেয়েও অনেক বেশি।

তার মতে, এ ধরনের গবেষণায় সামাজিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবের পার্থক্য ঠিকভাবে বিবেচনা করা হয় না। তাই দরিদ্র দেশগুলোর ওপর ১০ লাখ কোটি ডলারের ক্ষতির প্রভাব ধনী রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ। এ হিসাবের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য কার দায় কত, এর অর্থনৈতিক ক্ষতি কত, সে বিষয় এখন বিশ্বব্যাপী নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

গবেষণাটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার সব দেশ উন্নত রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করছে। বিশেষ করে কনসালট্যান্সি ফার্মগুলো সতর্ক করছে, শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানো নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে যে বিশাল তহবিলের প্রয়োজন, তা নিয়ে ধনী দেশগুলোর গড়িমসি বৈশ্বিক বৈষম্যকে আরো বাড়িয়ে তুলছে।

আরও