বাংলাদেশ শিল্প ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ একটি দেশ। সংগীত, থিয়েটার, সিনেমা ও কারুশিল্পের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য ও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা। এসব সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে কেবল শিল্পচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করে জিডিপি প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। একই সঙ্গে এসব শিল্পের বৈশ্বিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ‘সফট পাওয়ার’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সৃজনশীল শিল্পের বাণিজ্যিক বিকাশ, সাংস্কৃতিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রান্তিক কারিগরদের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ‘ক্রিয়েটিভ ফুটপ্রিন্টস’ শীর্ষক একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। এছাড়া স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হক এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের ও মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরীসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথাগত অর্থনৈতিক ভাবনায় শিল্প ও সংস্কৃতিকে সবসময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পেছনে রাখা হয়েছিল। বর্তমান সরকার এ চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে সৃজনশীল অর্থনীতিকে দেশের অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃদ্ধির নতুন উপাদান হিসেবে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের একার পক্ষে সবকিছু বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই নীতি ও অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাত এবং এনজিওগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারত্বের মাধ্যমে এ খাতকে সামনে এগিয়ে নেয়া হবে। সৃজনশীল খাতের প্রসারের লক্ষ্যে দেশীয় কারুশিল্পী, চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজাইনিং, ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্লাটফর্মের মাধ্যমে বিপণন সহায়তা দেয়া হবে।’
বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক উপাদানের ওপর গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সংস্কৃতি কেবল শিল্প, কারুশিল্প বা ব্যবসা নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ‘সফট পাওয়ার’ হতে পারে। সংগীত, থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও হস্তশিল্পের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে নিজস্ব অবস্থান শক্ত করাই আমাদের লক্ষ্য।’
অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বলেন, ‘বাংলাদেশের রয়েছে সমৃদ্ধ শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আর মানুষকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করতে শিল্পের অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতা দেখায় যে সৃজনশীলতা ও মেধায় বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যখন তার নিজস্ব সৃজনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলছে, তখন এক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে আরো সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। আমি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের সৃজনশীল গল্পের আরো বিস্তার দেখতে মুখিয়ে আছি।’
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, ‘একটি জাতির পরিচয়, তার বিবর্তন ও মানুষের কল্পনাশক্তিকে বোঝার অনন্য মাধ্যম শিল্পকলা। ‘ক্রিয়েটিভ ফুটপ্রিন্টস’ বইটির মাধ্যমে বাংলাদেশের চারুকলার পথচলাকে নথিবদ্ধ করার উদ্যোগে পাশে থাকতে পেরে আমরা গর্বিত। এ প্রকাশনার মাধ্যমে আমরা সেই শিল্পীদের সম্মান জানাতে পেরেছি, যাদের সৃষ্টিশীল কর্ম আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। আমাদের প্রত্যাশা বইটি শিল্প-ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগ ও উপলব্ধি জাগিয়ে তুলবে। পাশাপাশি শিল্পচর্চার এ আখ্যানগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও অনুরণিত হবে।’
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বলেন, ‘সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা দেশের শিল্প ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৩২ জন শিল্পীকে কেন্দ্র করে কাজটি সাজিয়েছি। তবে এ তালিকাটি চূড়ান্ত নয়। দেশের অসংখ্য শিল্পী আমাদের শিল্পাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করছেন। বর্তমান সরকার সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর যে গুরুত্ব দিচ্ছে, এ বইটি সেই ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
তিনি আরো জানান, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ১৯৮৭ সাল থেকে বাংলাদেশের শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রসারে কাজ করে যাচ্ছে। প্রদর্শনী, মানসম্পন্ন প্রকাশনা, আর্ট ক্যাম্প আয়োজন, অনুদান ও একটি টেকসই অভ্যন্তরীণ শিল্প অর্থনীতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।