চলতি বছরের এপ্রিলে বৈশ্বিক অপরিশোধিত ইস্পাত উৎপাদন টানা চতুর্থ মাসের মতো কমেছে। ব্রাসেলসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন ওয়ার্ল্ড স্টিল অ্যাসোসিয়েশনের (ডব্লিউএসএ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মূলত চীন, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো প্রধান অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। তবে এই মন্দার মধ্যেও প্রতিবেশী দেশ ভারত ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। খবর দ্য বিজনেসলাইন।
ডব্লিউএসএর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এপ্রিলে বিশ্বের ৬৯টি দেশে মোট অপরিশোধিত ইস্পাত উৎপাদন হয়েছে ১৫ কোটি ৩৪ লাখ টন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ উৎপাদন ১ দশমিক ৯ শতাংশ কম। শুধু এপ্রিলেই নয়, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) বিশ্বব্যাপী মোট ইস্পাত উৎপাদন ২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৬১ কোটি ৩৩ লাখ টনে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে চাহিদার ধীরগতি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক ইস্পাত শিল্প এখন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষ ইস্পাত উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে চীন নিজের অবস্থান ধরে রাখলেও দেশটিতে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এপ্রিলে চীনের ইস্পাত উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ৩৬ লাখ টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ কম। অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে চীনের সামগ্রিক উৎপাদন কমেছে ৪ দশমিক ১ শতাংশ। মোট উৎপাদন ৩৩ কোটি ১১ লাখ টনে নেমে এসেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চীনের আবাসন ও নির্মাণ খাতের চলমান মন্দার কারণেই দেশটির ইস্পাত উৎপাদন এভাবে কমছে।
তবে বৈশ্বিক এই মন্দা পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বজুড়ে উৎপাদন কমলেও ভারতে অপরিশোধিত ইস্পাত উৎপাদন ৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। শুধু এপ্রিলেই দেশটিতে মোট ইস্পাত উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৩৮ লাখ টন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-এপ্রিলে ভারতের ইস্পাত উৎপাদন ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৫ কোটি ৮৭ লাখ টনে পৌঁছেছে। এর পিছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে দেশটির অবকাঠামো খাতে সরকারের বড় বিনিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন। এজন্য বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে ভারত।
অন্য দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও এপ্রিলে ইস্পাত উৎপাদন ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৭২ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের সামগ্রিক উৎপাদন ৬ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপের দেশ জার্মানি ও তুরস্কও এপ্রিলে বেশ ভালো প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। দেশ দুটির ইস্পাত উৎপাদন যথাক্রমে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ও ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।
এর বিপরীতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এপ্রিলে এই অঞ্চলে ইস্পাত উৎপাদন রেকর্ড ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ কমে মাত্র ৩৭ লাখ টনে নেমে এসেছে। মূলত ভূরাজনৈতিক সংকট এবং বাজারে দুর্বল চাহিদাই মধ্যপ্রাচ্যের এই বড় পতনের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এর পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেনসহ অন্য দেশের উৎপাদনও ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। যুদ্ধাবস্থা বিদ্যমান থাকলে আগামী মাসগুলোতেও ইস্পাত খাতে এ চাপ বজায় থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।