হরমুজ নিয়ে আইইএর সতর্কতা

তেল সরবরাহ পুনরুদ্ধার না হলে ঝুঁকিতে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। খবর দ্য বিজনেসলাইন ও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

সম্প্রতি কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল এ কথা জানান। তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল নিরাপত্তা এখনো একটি খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ সংকটের সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে।’

ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ বা ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটটি সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। মাঝে যুদ্ধবিরতির একটি চুক্তি হলে সরবরাহ আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করে। কিন্তু উত্তেজনা আবার বেড়ে যাওয়ায় পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন আবার বন্ধ হয়ে যায়।

সংকট শুরুর পর পরই জ্বালানির দাম কিছুটা বাড়লেও বেশকিছু পদক্ষেপের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তাৎক্ষণিক বড় ধরনের আঘাত থেকে রক্ষা পায়। যুদ্ধ শুরুর আগে চীনের কাছে ১০০ কোটি ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুদ ছিল। পাশাপাশি বিদ্যুচ্চালিত যানবাহন (ইভি) ও গণপরিবহনের ব্যবহার বাড়িয়ে দেশটি জ্বালানির চাহিদা কমিয়ে আনে। এছাড়া আইইএর সমন্বয়ে সদস্য দেশগুলো বাজার সামলাতে চার কোটি ব্যারেল পর্যন্ত জরুরি মজুদ থেকে জ্বালানি তেল বাজারে ছাড়ে।

ফাতিহ বিরোল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এ ধরনের সাময়িক পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে সমাধান দিতে পারবে না। এ সংকটকে তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি বিপর্যয় হিসেবে অভিহিত করেছেন।

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উত্তোলক দেশ যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব উত্তোলন বাড়ালেও আইইএ প্রধান মনে করেন, এর একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক উত্তোলন ১০-২০ লাখ ব্যারেল বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু প্রণালির পুরো ঘাটতি মেটাতে এক লাফে এক কোটি ব্যারেল বাড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এ সংকটে বৈশ্বিক অর্থনীতি অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে এশিয়ার দেশগুলোয়, কারণ তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানির ৮০-৯০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলো অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়লেও বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে।

ফাতিহ বিরোল উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও তুলে ধরেন। জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় বিশেষ করে গ্রামীণ

নারী ও পরিবারগুলো খড়কুটো, কাঠ ও গোবরের মতো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছে। এতে ক্ষতিকর ধোঁয়া সৃষ্টি হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

মার্চে আইইএর জরুরি মজুদ থেকে জ্বালানি তেল ছাড়ার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলে প্রায় ২০ ডলার কমেছিল। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের নির্ধারিত মজুদের মাত্র ২০ শতাংশ ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরো পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ রয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ১৯৭০-এর দশকের তুলনায় বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের নির্ভরতা কিছুটা কমেছে এবং ব্যবহারের দক্ষতা বেড়েছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতি সাময়িক ধাক্কা সামলাতে পারছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিদিন ১৫-৩৫ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেলের ঘাটতি থেকে গেলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মারাত্মক মন্দা ডেকে আনতে পারে।

আরও