দেশের ৬৫ শতাংশের বেশি কাঁচা ও প্রক্রিয়াজাত চামড়া কম মূল্যের ‘ক্রাস্ট লেদার’ হিসেবে রফতানি হচ্ছে। বিপরীতে প্রক্রিয়াজাত চামড়া থেকে আসছে রফতানি আয়ের মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। উচ্চ মূল্যের পণ্য উৎপাদন কম, বাজার ধরতে না পারা ও নানা সংকটে চামড়া শিল্প দিন দিন রুগ্ণ হয়ে পড়ছে। ফলে বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ খাতের মূল্য সংযোজনের বড় সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে গতকাল আয়োজিত এক নীতি সংলাপে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) উপস্থাপিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান।
গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের অন্যতম প্রধান ক্রেতা এবং একই সঙ্গে প্রস্তুতকৃত চামড়াজাত পণ্যের বড় রফতানিকারক চীন, ভিয়েতনাম ও ইতালি। দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে কাঁচা বা আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া আমদানি করে তাতে মূল্য সংযোজনের পর বেশি দামে আবার রফতানি করে। ফলে এ পর্যায়ে বাংলাদেশ যে মূল্য সংযোজনের সুযোগ হারাচ্ছে, সেটিই খাতটির সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত সম্ভাবনা।
অনুষ্ঠানে সেলিম রায়হান জানান, বিশ্বের মোট গবাদিপশুর ২ দশমিক ৪ শতাংশ বাংলাদেশে থাকলেও বৈশ্বিক চামড়া উৎপাদনে দেশের অংশ মাত্র ১ দশমিক ১৩ শতাংশ। দেশে ২ শতাধিক ট্যানারি রয়েছে। এসব ট্যানারি বছরে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ বর্গফুট চামড়া উৎপাদন করে। তৈরি পোশাকের পর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এখনো দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি আয়ের উৎস। এ খাতে কাজ করেন প্রায় ১ লাখ ৯৮ হাজার মানুষ। বৃহত্তর ফুটওয়্যার ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি বাজার রয়েছে ১০৫টি দেশে। তবে জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং গত এক দশকে রফতানি আয় মোটামুটি স্থবির। গবেষণায় ক্রাস্ট লেদার রফতানি থেকে সরে এসে প্রস্তুতকৃত ও ব্র্যান্ডেড পণ্যে মূল্য সংযোজন, ডিজাইন ও কারিগরি দক্ষতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সনদ অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতকৃত পণ্যের দিকেই যেতে হবে। পোশাক শিল্পের জন্য যেভাবে তুলা আমদানি করা হয়, একইভাবে প্রক্রিয়াজাত করার জন্য বাংলাদেশ কাঁচা চামড়া আমদানিও করতে পারে।’ সমন্বিত কৌশল ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা গেলে ৫ বিলিয়ন ডলারের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলীয় হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিনটন পবকে বলেন, ‘এ খাতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের দিকে যাচ্ছে। ফলে আগামী দুই বছরে নেয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, দেশের চামড়া শিল্প মূল্য সংযোজনের সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে কিনা।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘চামড়া শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ফিরিয়ে আনতে ট্যানারি খাতে সংস্কার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিতে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। দীর্ঘদিন বিনিয়োগ করেও যারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী বা সক্ষম নন, তাদের জন্য ‘গ্রেসফুল এক্সিট’-এর সুযোগ তৈরি করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় শিল্পটি ক্ষতির মুখে পড়েছে। ভবিষ্যতে ট্যানারি ব্যবসায় শতভাগ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ অর্জন বাধ্যতামূলক করা হবে।’
কাঁচা চামড়া রফতানির পরিবর্তে দেশে প্রক্রিয়াজাত করে জুতা, ব্যাগ ও উচ্চ মূল্যের চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ লেদার ব্র্যান্ড’ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
চামড়া শিল্পের অন্যতম বড় সমস্যা সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) প্রসঙ্গে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘নতুন বিশ্বমানের সিইটিপি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান সিইটিপি সংস্কারের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রকল্পিত ২৫ হাজার ঘনমিটার সক্ষমতার বিপরীতে কার্যকরভাবে ১৪-১৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য শোধন করা সম্ভব হচ্ছে।’
বড় ট্যানারিগুলোর জন্য নিজস্ব ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ছোট ট্যানারিগুলো কেন্দ্রীয় সিইটিপির সঙ্গে সমন্বয় করে শতভাগ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করবে। ট্যানারির কঠিন বর্জ্য থেকে ট্যালো, হাড়ের গুঁড়া ও অন্যান্য ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরির জন্য কয়েকটি কারখানা স্থাপনের উদ্যোগও নেয়া হবে। এর মাধ্যমে সাভার ট্যানারি শিল্প এলাকাকে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।’
বাণিজ্যমন্ত্রী আরো জানান, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপে বাণিজ্য সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্পেন ও ইতালির বড় চামড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে সাভারে চামড়া ও অন্যান্য শিল্পের জন্য দক্ষতা ও ডিজাইন উন্নয়ন কেন্দ্র চালুর লক্ষ্যও রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।