দেশের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) খাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরে নানামুখী কার্যক্রম ও উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে আসছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়াটারএইড। এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সংস্থাটি গত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গ্রহণ করেছে একটি নতুন ও সময়োপযোগী উদ্যোগ: Women’s Returnship Programme , যার প্রথম পর্যায় ইতোমধ্যেই সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
এই প্রোগ্রামটির মূল লক্ষ্য ছিল কর্মজীবনে বিভিন্ন কারণে বিরতি নেওয়া নারীদের পুনরায় পেশাগত জীবনে ফিরে আসার পথ সুগম করা। বিশেষভাবে, কর্মজীবনে প্রত্যাবর্তনের সময় নারীরা যে সামাজিক, পেশাগত ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন, তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানই ছিল এই কর্মসূচি এবং প্রশিক্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ক্যারিয়ারে সাময়িক বিরতি মানেই কি থেমে যাওয়া? নাকি কখনো কখনো সেই বিরতিই হয়ে ওঠে নতুন করে নিজেকে আবিষ্কারের সূচনা? সামিয়া তাসমিনের জীবনগাথা দ্বিতীয় প্রশ্নটিরই শক্ত জবাব। পেশাজীবনে বিরতির পর আবার আত্মবিশ্বাস, দক্ষতা ও নেতৃত্ব নিয়ে ফিরে আসার এই গল্প শুধু একজন নারীর নয়; এ গল্প অসংখ্য নারীর আশা ও সম্ভাবনার উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
সামিয়া তাসমিন এই কর্মসূচির একজন অনন্য উদাহরণ। বিরতির আগে তিনি ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনে (DAM) প্রায় আট বছর কাজ করেছেন। কর্মজীবনের পাশাপাশি মাতৃত্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। ২০১৮ সালে প্রথম সন্তানের জন্মের সময় তিনি উপলব্ধি করেন, ঢাকার আশপাশে মানসম্মত ডে-কেয়ার সেবার ঘাটতি কতটা প্রকট। এই প্রয়োজনবোধ থেকেই তিনি DAM কর্তৃপক্ষের কাছে একটি ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের প্রস্তাব দেন এবং পরবর্তীতে সেটি বাস্তবায়িত হয়।
সেখান থেকেই শুরু হয় তার নেতৃত্বের নতুন অধ্যায়। সামিয়ার তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে ডে-কেয়ার কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। গ্রামীণফোন, আইসিডিডিআরবি, সেভ দ্য চিলড্রেন, হামিম অ্যাপারেল গ্রুপসহ বিভিন্ন কর্পোরেট ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সেবা প্রদানে যুক্ত হয় DAM। একসময় এই সংস্থায় ‘লিটল ডাকলিংস’ ডে-কেয়ার সেন্টারে প্রায় ২০০ শিশু ও ৬০ জন শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত ছিল।
এরপর তার কর্মজীবনের পথে আসে বিরতি। ২০২৪ সালে দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর সামিয়া কিছু সময়ের জন্য কর্মজীবন থেকে সরে দাঁড়ান। এই বিরতি তার জন্য সহজ ছিল না। তিনি বলেন, যে কোন পরিবেশে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে যখন বলতে হতো ‘আমি এখন ক্যারিয়ার ব্রেকে আছি’, তখন ভেতরে গভীর এক আত্মসংকট এবং বিব্রতকর অবস্থা কাজ করত। তার ভাষায়, “এটা কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত ছিল না। ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম আমি সবই সামলাচ্ছি, কিন্তু নিজের জন্য কোথাও জায়গা নেই।”
এই মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে বড় ভূমিকা রাখে তার পরিবার, বিশেষ করে স্থপতি স্বামী রেজওয়ানুল হক। সামিয়া অকপটে স্বীকার করেন, স্বামীর অনুপ্রেরণা ও বিশ্বাসই তাকে বারবার সাহস জুগিয়েছে সামনে এগিয়ে যেতে।
ঠিক এই সময়েই এই কর্মসূচিতে যুক্ত হন তিনি। তার ভাষায়, “এই প্রোগ্রাম ছিল আমার আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার নিরাপদ জায়গা।” নেতৃত্ব, ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স ও আত্মউন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। প্রথম দিকে অংশগ্রহণকারীরা যেখানে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, প্রোগ্রাম শেষে তারাই হয়ে ওঠেন আত্মবিশ্বাসী ও ইতিবাচক মনোভাবসম্পন্ন।
সামিয়া তাসমিনের মতো আরও বেশ কয়েকজন কর্মজীবনে খণ্ডকালীন বিরতিতে থাকার পর ফিরে আসার ক্ষেত্রে এই কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণ লাভ করে তাদের খণ্ডকালীন ক্যারিয়ার ব্রেকের পর আবার সাফল্যের সাথে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছেন তাদের নিজ নিজ পেশা ও উদ্যোগের মূল ধারায়।
এই প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতার পরই ২০২৫ সালের জুনে সামিয়া প্রতিষ্ঠা করেন Nurture 360 Childcare Set-up and Training -একটি ডে-কেয়ার কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে তিনি প্রি-স্কুল ও ডে-কেয়ার সেন্টারের নকশা, পরিচালনা, জনবল প্রশিক্ষণ ও সেবার মানোন্নয়নে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে বিটিআরসি, ব্র্যাক ও বেজাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে তিনি নারীকেন্দ্রিক উদ্যোগে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছেন।
আজ একজন স্বাধীন উদ্যোক্তা হিসেবে সময়ের বাঁধাধরা নিয়মে আবদ্ধ নন সামিয়া। কাজ ও পরিবারের ভারসাম্য তিনি নিজের মতো করে গড়ে নিয়েছেন। নিজের উদ্যোগ থেকে প্রথম আয়ের দিনটি স্মরণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “পরিবার নিয়ে বাইরে খেতে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, আমি আবার নিজের কাছে ফিরে এসেছি।”
পেশাজীবনে বিরতিতে থাকা নারীদের উদ্দেশে তার বার্তা স্পষ্ট: “কখনোই দেরি হয়ে যায় না। বিরতি মানেই শেষ নয়। লক্ষ্যটাই আসল, বিরতির দৈর্ঘ্য নয়। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন, আপনি অবশ্যই ফিরবেন।”
সামিয়া তাসমিনের বিরতি থেকে ফেরার এই যাত্রা প্রমাণ করে, কর্মজীবনে বিরতির পরও নারীরা নতুন করে নেতৃত্ব দিতে, স্বপ্ন পূরণ করতে এবং অন্যদের জন্য পথ দেখাতে পারেন। এই ফিরে আসার যাত্রাই সত্যিকারের অনির্বাণ; যেখানে বিরতি বাধা নয়, বরং শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের উৎস হয়ে ওঠে।
অংশগ্রহণকারী নারীদের দক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং মানসিক শক্তি পুনরুদ্ধারের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই কর্মসূচিতে। সহায়ক পরিবেশে প্রশিক্ষণ, দিকনির্দেশনা ও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এই নারীরা পুনরায় কর্মক্ষেত্রে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পান, সে বিষয়ে বিশেষভাবে নজর দেয়া হয়েছে যা তাদের পূর্ণ উদ্যোমে পেশাগত জীবনে ফিরে আসতে সহায়তা করে।
এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন শুধু অংশগ্রহণকারী নারীদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত উন্নয়নেই অবদান রাখেনি, বরং কর্মক্ষেত্রে নারীর অন্তর্ভুক্তি ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ওয়াটারএইডের অঙ্গীকারকে আরও সুদৃঢ় করেছে।