বিশ্বজুড়ে চলতি বছর পণ্য বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ করেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিসংক্রান্ত চাহিদা বৃদ্ধি, রেকর্ড বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা এ প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এর আগে গত মার্চে সংস্থাটি ২০২৬ সালে বিশ্ব পণ্য বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৯ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও পরিবহন খাতে বিঘ্ন ঘটলেও প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা এবং বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা বিশ্ব বাণিজ্যকে এগিয়ে নিচ্ছে। খবর আনাদোলু এজেন্সি।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ডব্লিউটিওর সদর দপ্তর থেকে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ‘গ্লোবাল ট্রেড আউটলুক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস’ প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেয়া হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও আঞ্চলিক অস্থিরতায় বৈশ্বিক জ্বালানি, সার ও পরিবহন বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা লাগলেও এআই খাতের চাঙ্গা ভাব সে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বড় ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে সরবরাহকারীরা বিকল্প উৎস ও পরিবহন পথ ব্যবহার করায় বাণিজ্যের গতি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
পণ্য বাণিজ্যের পূর্বাভাস বাড়ালেও সেবা বাণিজ্য নিয়ে আগের চেয়ে কম আশাবাদী ডব্লিউটিও। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বে সেবা বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। গত মার্চে এ হার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ ধরা হয়েছিল। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের প্রভাব সেবা খাতের ওপর বেশি পড়তে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। এ সময় জ্বালানি তেলের বাজার, সার সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এ গতি পূর্বাভাসকে ছাপিয়ে গেছে।
বেড়েছে এআই পণ্যের বাণিজ্য
এ বছরের প্রথম অর্ধে পণ্য বাণিজ্যের ধারাবাহিক ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল এআই খাতের প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট পণ্যের। ডব্লিউটিওর হিসাব অনুযায়ী, সেমিকন্ডাক্টর ও সার্ভারের মতো এআই-সহায়ক যন্ত্রাংশের বিশ্ব বাণিজ্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৭ শতাংশ বেড়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে পণ্য বাণিজ্যের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির প্রায় ৪৭ শতাংশই এসেছে এই একক খাত থেকে।
ডব্লিউটিও উল্লেখ করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা এবং লোহিত সাগরের নৌপথে নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বেশ নমনীয় ও স্থিতিস্থাপকতার পরিচয় দিয়েছে। বাণিজ্যপথ অবরুদ্ধ হওয়ার মুখে বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীরা দ্রুত বিকল্প পথ ব্যবহার শুরু করেন। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে কাঁচামাল ও পণ্য সংগ্রহ করায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপ্রবাহ থমকে যায়নি।
বিকল্প উৎসের কারণে কমেছে জ্বালানির সরবরাহ চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে অঞ্চলটি থেকে জ্বালানি রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে অঞ্চলটি থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানি কমেছে ৪৭ শতাংশ। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এ ঘাটতি পূরণ করেছে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলো। বিকল্প এসব দেশ থেকে রফতানি বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সার্বিক রফতানি ঘাটতি মাত্র ৬ শতাংশে নেমে আসে। আর এলএনজির বিশ্ব রফতানি কমেছে মাত্র ১ শতাংশ। অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ কমলেও বিকল্প উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহ করে ঘাটতির বড় অংশ সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছে।
একইভাবে রাসায়নিক সারের আন্তর্জাতিক বাজারেও মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের উৎপাদনকারীরা এগিয়ে এসে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করেছে। বাণিজ্যপথ পরিবর্তন করে অন্য সমুদ্রবন্দর ও বিকল্প করিডোর ব্যবহার করায় জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকে। বছরের শুরু থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে কনটেইনার পরিবহন ৩ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে।
সমান সুফল পাচ্ছে না সব দেশ
পণ্য বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি বাড়লেও এর সুফল সব দেশ সমানভাবে পাচ্ছে না বলে সতর্ক করেছে ডব্লিউটিও। যেসব দেশ নির্দিষ্ট সরবরাহকারী বা পরিবহনপথের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তারা সংঘাতের কারণে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুবিধা সব দেশের জন্য সমান নয়।
সংস্থাটির মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা বলেন, ‘সমন্বিত বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং নিয়মভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থা সংকটের সময় প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। তবে সংঘাতের প্রভাব সব দেশের ওপর সমানভাবে পড়েনি। কিছু অর্থনীতি তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া এআইয়ের মতো নতুন খাতের সুযোগ কাজে লাগানোর সক্ষমতাও দেশভেদে ভিন্ন।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে যেকোনো অর্থনৈতিক বা ভূরাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করা যায়।’ পাশাপাশি ধনী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভেতরের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে বাণিজ্য সুবিধা সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন ডব্লিউটিও প্রধান।
২০২৭ সালেও প্রবৃদ্ধির আশা
আগামী বছর বিশ্ব পণ্য বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ডব্লিউটিও। একই সময়ে সেবা বাণিজ্যে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করছে সংস্থাটি।
এ পূর্বাভাস অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, সরবরাহ ব্যবস্থার পরিস্থিতি এবং প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পণ্য বাণিজ্যের ইতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি সেবা খাতের দুর্বল পূর্বাভাস ও সুযোগের অসম বণ্টন বৈশ্বিক বাণিজ্যের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকছে।