আন্তর্জাতিক বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাঁচামাল ও পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে ১৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চের কাছাকাছি পৌঁছেছে। জ্বালানি তেলের দরবৃদ্ধি, তামার রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি এবং স্বর্ণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার কারণে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি আবার বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদহারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দর পর্যবেক্ষণকারী সূচক ‘এফটিএসই/কোরকমোডিটি সিআরবি ইনডেক্স’ সম্প্রতি ৪২০ পয়েন্টে উঠেছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকের তুলনায় সূচকটি প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। ২০০৮ সালের আগস্টের পর সূচকটি আর এত ওপরে ওঠেনি। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষকদের মতে, সূচকটি এখন ২০০৮ সালের জুলাইয়ে রেকর্ড ৪৭৪ পয়েন্টের কাছাকাছি অবস্থান করছে। ওই সময়ও বিভিন্ন পণ্যের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল। পরে লেহম্যান ব্রাদার্সের (তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের বড় বিনিয়োগ ব্যাংক) পতনে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধাক্কা খায়।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত তিনটি প্রধান কারণে বাজারে এ বড় ধরনের দরবৃদ্ধি ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও অস্থিরতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির প্রসারে শিল্পপণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং ডলারের ওপর বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া এক ধরনের অনাস্থা।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ সমুদ্রপথ দিয়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সময়ে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে।
কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ২০০৮ বা ২০২২ সালের মতো নয়। এখনো জ্বালানি তেলের দাম ওই দুই সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের চেয়ে নিচে রয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের পণ্যবাজারবিষয়ক গবেষণার সহপ্রধান ডান স্ট্রুইভেন বলেন, ‘বৃহৎ মজুদ এবং যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ায় এবার জ্বালানি তেলের দাম ২০০৮ বা ২০২২ সালের মতো ব্যাপকভাবে বাড়েনি। তবে শোধনাগার খাতের বাজার এখনো চাপে রয়েছে এবং পরিশোধন মুনাফা বেড়েছে।’
অন্যদিকে শুধু জ্বালানি নয়, শিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধাতুর দামও দ্রুত বাড়ছে। এআইচালিত ডেটা সেন্টার ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়ে তামার ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ পরিবাহী তারসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশে তামার ব্যবহার থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তামা সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে।
মিজুহো ব্যাংকের পরিচালক কাজুতোমো নোমুরা বলেন, ‘এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদাও। ফলে ডেটা সেন্টার ও ইভিতে তামার ব্যবহার বাড়ছে।’
পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ডলারে লেনদেন হওয়া পণ্য অন্য দেশের ক্রেতাদের কাছে তুলনামূলক সস্তা হওয়ায় কেনাকাটা বাড়ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলারে রাখা সম্পদ জব্দ হওয়ার আশঙ্কায় ২০২২ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে স্বর্ণ কেনা বাড়িয়েছে। ফলে ২০০৮ সালের তুলনায় বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে।
পণ্যের দাম বাড়ার প্রভাব পড়তে পারে মুদ্রাস্ফীতিতেও। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবে, ২০২২ সালে বিশ্ব মুদ্রাস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশে উঠেছিল। ২০২৫ সালে তা ৪ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসে। তবে জুলাইয়ের পূর্বাভাসে আইএমএফ জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি আবার বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। সংস্থাটি বলেছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে চলমান মুদ্রাস্ফীতি কমার প্রবণতা এখন থেমে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিও এর অন্যতম কারণ।
জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের এ লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ কঠিন করে তুলবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে সুদহার কমানোর সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে। আর জাপানের মতো সম্পদ আমদানিনির্ভর দেশগুলোয় কাঁচামালের চড়া দাম এবং ইয়েনের বিনিময় হার কমে যাওয়ায় দেশটির সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।