এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের প্রতিবেদন

বিশ্বজুড়ে আগামী বছর দেখা দিতে পারে খাদ্য সংকট

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে গেছে।

জ্বালানি ও সার সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং এল নিনোর প্রভাবে ২০২৭ সালে বিশ্বজুড়ে দেখা দিতে পারে খাদ্য সংকট। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সার সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে বড় কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী দেশগুলোয় ফসল উৎপাদন কমে গেলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, জ্বালানি ও সারের বাড়তি দাম, জৈব জ্বালানির চাহিদা এবং এল নিনোর প্রভাব একসঙ্গে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহে চাপ তৈরি করছে। খাদ্য সংকট অবশ্যম্ভাবী না হলেও বাড়ছে এর ঝুঁকি।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে গেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো। বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া ইউরিয়ার প্রায় ৩০ শতাংশ, সালফারের অর্ধেক এবং অ্যামোনিয়ার ২১ শতাংশও এ প্রণালিনির্ভর।

সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় শুধু সারের দামই বাড়ছে না, বাড়ছে উৎপাদন খরচও। কারণ অনেক দেশে সার উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস কাঁচামাল ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়তি ঝুঁকি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে। ভারত উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ইউরিয়া আমদানি করে। দেশটির অভ্যন্তরীণ ইউরিয়া উৎপাদনের প্রায় ৮৫ শতাংশে এলএনজি ব্যবহার করা হয়।

এদিকে কৃষিকাজের প্রধান জ্বালানি ডিজেলের দামও দ্রুত বাড়ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে কমেছে সরবরাহ। মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়া সাধারণত বিশ্বের মোট নিট ডিজেল রফতানির প্রায় অর্ধেক সরবরাহ করে। কিন্তু চলতি বছরের জুলাইয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ডিজেল রফতানি দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে আসে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলা ও রাশিয়ার রফতানি নিষেধাজ্ঞায় দেশটির ডিজেল রফতানিও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের হিসাবে, গত সেপ্টেম্বরে এক ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও ডিজেলের দামের ব্যবধান ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। সাধারণত এ ব্যবধান ১২-২০ ডলারের মধ্যে থাকে। বাড়তি খরচ সামলাতে কৃষকরা সার ব্যবহার ও আবাদি জমির পরিমাণ কমাতে পারেন। এতে খাদ্য উৎপাদন কমার আশঙ্কা রয়েছে।

এল নিনো বাড়াবে উৎপাদন ঝুঁকি

এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এল নিনোর প্রভাব। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এতে তাপপ্রবাহ ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়বে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ব্রাজিলে ভুট্টা উৎপাদনের পূর্বাভাস ৬০ লাখ টন কমিয়ে ১৩ কোটি ৭০ লাখ টন করেছে। এল নিনো তীব্র হলে উৎপাদন আরো এক কোটি টন কমতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় গম উৎপাদন ২ কোটি ৮০ লাখ থেকে কমে নামতে পারে ২ কোটি ২০ লাখ টনে। ভারতে সেপ্টেম্বরে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৪ শতাংশ কম বৃষ্টি হওয়ায় গম উৎপাদন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ব্রাজিলে সয়াবিন উৎপাদনের পূর্বাভাসও ৬০ লাখ টন কমিয়ে ১৭ কোটি ৭০ লাখ টন করা হয়েছে। দেশটি চীনের সবচেয়ে বড় সয়াবিন সরবরাহকারী হওয়ায় উৎপাদন কমলে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন আয়ের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব দেশে পরিবারের মোট ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক খাদ্যের পেছনে যায়। ফলে খাদ্যের দাম বাড়লে এসব দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা আরো দুর্বল হবে।

আরও