হরমুজে নতুন নৌপথ নিয়ে ওমানের সঙ্গে চুক্তির পথে ইরান

বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বিশ্ববাজারে। তেলের দামও কিছুটা স্থির রয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগকারীদের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্যের দিকে। আগামীকাল দেশটির জুলাইয়ের ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআইয়ের তথ্য প্রকাশ হওয়ার কথা। এসবের প্রভাবে গতকাল বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। খবর রয়টার্স।

ইউরোপের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোর সূচক স্টক্স ৬০০ গতকাল বেড়েছে দশমিক ১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের ফিউচার বেড়েছে দশমিক ২ শতাংশ। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাকের ফিউচার বেড়েছে দশমিক ৪ শতাংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজার নিয়ে এমএসসিআইয়ের সূচকও বেড়েছে দশমিক ১ শতাংশ।

এশিয়ার শেয়ারবাজারেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই সূচক বেড়েছে ২ দশমিক ১ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার সূচক বেড়েছে দশমিক ৭ শতাংশ। এর আগে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের সূচকগুলো রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছিল। প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল মার্কিন কর্মসংস্থানের তথ্য প্রকাশের পর ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ কিছুটা কমে। এর প্রভাব পড়ে এশিয়ার বাজারেও।

বিশ্ববাজারের সাম্প্রতিক গতিপথে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। ইরান জানিয়েছে, প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ওমানের সঙ্গে নতুন নৌপথ নির্ধারণের বিষয়ে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রোববার বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির একটি “সাময়িক রুট” নিশ্চিত করতে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত সমাধানের খুব কাছাকাছি রয়েছে।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রকে আরো কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে বলে স্পষ্ট করেছে ইরান। এর পরই হরমুজ প্রণালি ফের খুলে দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে দেশটি।

হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এখনো প্রণালিটি দিয়ে খুব সীমিত পরিমাণে জাহাজ চলাচল করছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।

এর প্রভাব তেলের বাজারেও দেখা গেছে। গতকাল আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৩ ডলার ৫০ সেন্টের আশপাশে ছিল। আগের তুলনায় দাম খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। তবে চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে যে দাম উঠেছিল, তার তুলনায় বর্তমান দাম অনেক কম। এপ্রিলের শেষ দিকে ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ওঠে ১২৬ ডলারের বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম স্থিতিশীল থাকা শেয়ারবাজারের জন্যও স্বস্তির খবর। কারণ জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার কমানোর বদলে বাড়ানোর পথে যেতে পারে। তাই জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা না থাকলে বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপও তুলনামূলক কম থাকে।

বিশ্ববাজারে এখন আরেকটি বড় বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি। রয়টার্সের জরিপে অংশ নেয়া অর্থনীতিবিদরা ধারণা করছেন, জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা মূল্যসূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে। জুনে এ হার ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) নীতি সুদহার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশাও বদলেছে। জেফরিজের জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ মোহিত কুমার বলেন, ‘চলতি বছর ফেড সুদহার বাড়াবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ সপ্তাহের মূল্যস্ফীতির তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।’

তার মতে, জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রিত থাকলে ও আরো কমলে ফেডের সুদহার বাড়ানোর প্রয়োজন কমে যাবে। অর্থাৎ জ্বালানির বাজার ও মূল্যস্ফীতির তথ্য এখন ফেডের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক শেয়ারবাজার সাম্প্রতিক সময়ে রেকর্ড উচ্চতায় ওঠার পেছনে আরেকটি কারণ হলো কোম্পানিগুলোর শক্তিশালী আর্থিক প্রতিবেদন। গত প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোম্পানিগুলোর আয় প্রত্যাশার তুলনায় বেশি ছিল। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে।

ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষকরা জানান, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের আওতাভুক্ত কোম্পানিগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। এসব কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

প্রকাশিত ফলাফলের প্রায় ৭৬ শতাংশই বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০২১ সালের পর এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ফলাফলগুলোর একটি। কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়ার প্রবণতা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আশাবাদ বাড়িয়েছে।

শেয়ারবাজারের পাশাপাশি বন্ডের বাজারেও কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড গতকাল ১ বেসিস পয়েন্ট কমে ৪ দশমিক ৬৪৩ শতাংশ হয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি সপ্তাহে ১২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের নতুন ট্রেজারি বন্ড বাজারে আসতে পারে। ফলে বন্ডবাজারেও বিনিয়োগকারীদের নজর রয়েছে।

এদিকে মুদ্রাবাজারে তেমন বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। গতকাল ইউরোর দাম সাত সপ্তাহের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি ছিল। প্রতি ইউরোর দাম ছিল ১ দশমিক ১৫৬ ডলারের কাছাকাছি।

অন্যদিকে জাপানি ইয়েনের বিপরীতে ডলারের দাম দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১৫৮ দশমিক ৪৮ ইয়েনে উঠেছে। তবে ইয়েনের দরপতন নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা রয়েছে। কারণ জাপান সরকার মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে এখনো আশঙ্কা রয়েছে।

জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক অব জাপানের নীতিনির্ধারকরাও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জুলাইয়ের বৈঠকের মতামতের সারসংক্ষেপে বলা হয়, দেশটিতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ছে। এ কারণে প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত সুদহার বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। এতে সেপ্টেম্বরে সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনাও জোরালো হয়েছে।

সব মিলিয়ে বৈশ্বিক শেয়ারবাজার এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। একদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা ও জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্যের দিকে তাকিয়ে আছেন বিনিয়োগকারীরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফেডের নীতি সুদহার ও বড় কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফল।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ মুহূর্তে বাজারে বড় কোনো ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এখনো সীমিত। মূল্যস্ফীতির তথ্যও সামনে আসেনি। ফলে আগামী কয়েক দিনে জ্বালানি তেলের দাম, যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি এবং ফেডের সুদহার নিয়ে প্রত্যাশার পরিবর্তন বিশ্ববাজারের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।

আরও