সিপিডির কর ন্যায্যতাবিষয়ক সংলাপ

ন্যায়ভিত্তিক রাজস্ব কাঠামো গঠনে ভ্যাট নয়, প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর তাগিদ

সরকার রাজস্ব বাড়ানোর যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে, তা যেন সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করে।

বর্তমানে মোট রাজস্বের একক সর্বোচ্চ ৩৮ শতাংশ ভ্যাট থেকে আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বৈষম্যমূলক এবং দরিদ্র মানুষের ওপর অসম চাপ সৃষ্টি করে। এ বৈষম্য দূর করতে ভ্যাটের স্তর ও আদর্শ হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ন্যায়ভিত্তিক রাজস্ব কাঠামো গঠনে ভ্যাট নয়, প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও ক্রিশ্চিয়ান এইডের যৌথ উদ্যোগে ‘জাতীয় বাজেটে কর ন্যায্যতা: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আর্থিক প্রস্তাবের ওপর পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক এক সংলাপে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী তামিম আহমেদ।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের সঞ্চালনায় সংলাপে বক্তব্য দেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (কর নীতি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী, বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ও ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’-এর কো-অর্ডিনেটর ফাহিম মাশরুর, আয়কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশিস বড়ুয়া, কর আইনজীবী মিজানুর রহমান এবং চালডালের সহপ্রতিষ্ঠাতা জিয়া আশরাফ প্রমুখ।

এনবিআরের সদস্য (কর নীতি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার ন্যূনতম করের অন্যায্য প্রথা থেকে বেরিয়ে এসেছে। উন্নত দেশে প্রত্যক্ষ করের হার ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা মাত্র ৩৫ শতাংশ। বড় শিল্পোদ্যোক্তারা যেন অন্যায্য সুবিধা না পান এবং তরুণ উদ্যোক্তারা সুযোগ পান, সেজন্যই স্টার্টআপ সুবিধায় ১০০ কোটি টাকার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ইন্টার-কোম্পানি ঋণের ক্ষেত্রে অপব্যবহার রোধে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রেখে ১০০ শতাংশ সুদকে ব্যবসায়িক ব্যয় হিসেবে দেখানোর সুযোগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিতে আপিল ফি ২৫ থেকে ১০ শতাংশে এবং ট্রাইব্যুনালে ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

ড. আবদুল মজিদ কর হয়রানি রোধে উপজেলা পর্যায়ে ট্যাক্স ক্যাম্প চালুর পরামর্শ দেন। এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) কম হওয়ার কারণ অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে আনুষ্ঠানিক খাতের ওপর দশমিক ২ শতাংশ অগ্রিম করের চাপ, ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং টাকার অবমূল্যায়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ইন্টার-কোম্পানি লেনদেন এবং সাব-কন্ট্রাক্ট বিলের ওপর বাড়তি উৎসে কর আরোপের তীব্র সমালোচনা করেন। গার্মেন্ট খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে রয়েছে এবং বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে আছে উল্লেখ করে তিনি এসব নিয়মকে শিল্প ধ্বংসের পরিকল্পিত ছক ও জুলুম বলে আখ্যা দেন।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা এবং অযৌক্তিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার কারণে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বৃদ্ধির সমালোচনা করেন। তিনি এসএমই খাতের সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ এবং একটি জবাবদিহিতা কমিশন গঠনের দাবি জানান।

বিসিআইয়ের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি প্রীতি চক্রবর্তী ব্যাংক খাতের অর্থসংকট ও বেসরকারি খাতের সংকোচন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কর আরোপকে অত্যন্ত অন্যায্য এবং ব্যবসায়ীদের জন্য ভীতিকর বলে মন্তব্য করেন।

আরও