কৃষি ফসলের সুরক্ষায় অত্যাবশ্যকীয় উপাদান বালাইনাশকের কাঁচামালের সহযোগী উপাদান আমদানিতে স্থানীয় উৎপাদকদের ৫৮ দশমিক ৬০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। আর বিদেশ থেকে প্রস্তুত কীটনাশক, আগাছানাশক ও ছত্রাকনাশক আমদানিতে শুল্ক মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ। এ অবস্থায় দেশে বালাইনাশক উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় উৎপাদকরা। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কারের কথাও বলেছেন তারা।
উৎপাদকরা জানান, দেশের কৃষি উৎপাদনকে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’, টেকসই ও রফতানিমুখী করতে বালাইনাশক শিল্পে স্বনির্ভরতার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। সরকারও আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশে মানসম্মত বালাইনাশক উৎপাদন বাড়াতে আগ্রহী। তবে বাস্তবতা হলো দেশে ১০ শতাংশ বালাইনাশক তৈরিতে যে পরিমাণ কাঁচামাল প্রয়োজন, তা আমদানি করা হয়; আর বাকি ৯০ শতাংশ প্রস্তুত বা ব্যবহারযোগ্য পণ্য সরাসরি আমদানি করা হয়।
কাঁচামালের ওপর আরোপিত শুল্ক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রস্তুত কীটনাশক, আগাছানাশক ও ছত্রাকনাশক আমদানিতে শুল্কহার ১০ শতাংশ। বালাইনাশক তৈরিতে ব্যবহৃত কিছু কাঁচামালে ৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। কিন্তু বালাইনাশকের কাঁচামাল সহায়ক উপাদানে শুল্কের হার অনেক বেশি—৩৭ শতাংশ থেকে প্রায় ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত। এ কারণে দেশে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
তাই আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে কম খরচে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং শিল্পটিকে রফতানিমুখী করতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনা ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোর জন্য নীতিগত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
গত বৃহস্পতিবার এগ্রোকেমিক্যাল খাতে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে করণীয় নির্ধারণে প্রধান উপদেষ্টার অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এক সভায় পাঁচ দাবি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বামা) নেতারা।
তারা বলেন, ‘প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নীতিসহায়তা পেলে বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যেই এগ্রোকেমিক্যাল শিল্পে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। আশির দশকে দেশের চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ ওষুধ দেশে উৎপাদিত এবং ৯০ শতাংশ আমদানি হতো। তবে বর্তমানে ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ, যা দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করে এবং রফতানিও হচ্ছে। কিন্তু এখনো এগ্রোকেমিক্যাল একই জায়গায় আটকে আছে। প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা পেলে এগ্রোকেমিক্যাল দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানিও করা সম্ভব হতে পারে।’
সভায় বামার পক্ষ থেকে পাঁচটি দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বামার তালিকাভুক্ত ৩২টি সহায়ক উপাদান, যা বালাইনাশক উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, সেগুলো আমদানিতে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেয়া। কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী ‘সিঙ্গেল কান্ট্রি সিঙ্গেল সোর্স’ নীতিমালার পরিবর্তে ‘মাল্টিপল সোর্স’ ব্যবস্থা চালু করা। বন্দর থেকে বালাইনাশক উৎপাদনে আমদানীকৃত কাঁচামাল ছাড়করণে (এনওসি) প্রক্রিয়া সহজ করা। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই জনস্বার্থ ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং সুবিধা দেয়া এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী বালাইনাশক টেকনিক্যাল উপদেষ্টা কমিটিতে বামার সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা।
এ বিষয়ে বামা সভাপতি কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোনো শিল্পের ওপর ৫৮ দশমিক ৬০ শতাংশ শুল্ক যৌক্তিক হতে পারে না। সরকার কোনো না কোনো শিল্পকে বাড়তি সুরক্ষা দিতে কাঁচামাল সহযোগী উপাদানের ওপর এত শুল্ক আরোপ করেছে। এর মাধ্যমে আমদানিকারকরা সুবিধা পাবে আর যারা দেশে উৎপাদন করতে চাচ্ছে তাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। যেসব ফিনিশ পণ্য বাইরে থেকে আসছে, সেখানে ৫ থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক অথচ কাঁচামালের উপাদান আনতে দিতে হচ্ছে ৫৮ শতাংশ। এছাড়া কাঁচামাল আমদানিতে দুটি সোর্সকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। এ কারণেও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বিদ্যমান আইনের আলোকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এটি করা হচ্ছে। আমরা দাবি জানিয়েছি, সোর্স নির্দিষ্ট না করে মাল্টিপল করে দেয়া হোক।’
তিনি আরো বলেন, ‘এখনই সময় নীতিগত বাধা দূর করে দেশীয় বালাইনাশক শিল্পকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর। এতে কৃষক উপকৃত হবেন, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল শিল্প একটি রফতানিমুখী শিল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।’