বিশ্ব অর্থনীতিতে একসময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পারস্পরিক নির্ভরতা। একটি দেশ উৎপাদন করবে, অন্য দেশ কাঁচামাল দেবে, আরেক দেশ পণ্য কিনবে। এভাবেই গড়ে উঠেছিল বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের আন্তঃনির্ভরতার কারণে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বড় সংঘাতও কমবে বলে ধারণা করা হতো।
কিন্তু সে ধারণা এখন বদলে গেছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক বিরোধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিভিন্ন দেশের সরকারকে অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। বিদেশের ওপর বেশি নির্ভরতা এখন অনেক দেশের কাছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি। তাই গুরুত্বপূর্ণ পণ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর সরবরাহ নিজেদের উৎপাদন থেকেই নিশ্চিত করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। এ পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে এশিয়া।
বিশ্লেষক আবিশুর প্রকাশের মতে, বিশ্ব নতুন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে আগ্রসর হচ্ছে। সেখানে সরকারগুলো বিদেশের ওপর নির্ভরতাকে হুমকি হিসেবে দেখছে। তাই বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক ধাক্কা এলেও যেন অর্থনীতি সচল থাকে সেই কৌশল অবলম্বন করছে বিভিন্ন দেশ। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা যতটা সম্ভব দেশের ভেতরেই উৎপাদন ও সংরক্ষণ করা।
আবিশুর এ ধরনের অর্থনীতিকে ‘ফোর্ট্রেস ইকোনমি’ বা ‘দুর্গ অর্থনীতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ বাইরের সংকট যাতে দেশের অর্থনীতিকে সহজে অচল করতে না পারে, সেজন্য অর্থনীতিকে এক ধরনের দুর্গের মতো সুরক্ষিত করা।
জাপান এর একটি বড় উদাহরণ। আগামী ফেব্রুয়ারিতে দেশটি প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ইট্রিয়ামের মতো বিরল খনিজ উত্তোলনের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালাবে। লক্ষ্য শুধু নতুন খনিজ উৎস খুঁজে পাওয়া নয়। চীনের কাছ থেকে রফতানি বাধাগ্রস্ত হলেও যেন জাপানের সরবরাহ ব্যবস্থা সচল থাকে, সেটিও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
একই ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তাইওয়ানও। ১৬০টি মাইক্রোগ্রিড তৈরির কথা জানিয়েছে পূর্ব এশিয়ার দেশটি। মূল বিদ্যুৎ গ্রিড কোনো কারণে অচল হয়ে পড়লেও এসব মাইক্রোগ্রিড বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে। সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের মতো পরিস্থিতিতেও অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালু রাখাই এর উদ্দেশ্য। অর্থাৎ উৎপাদন হোক বা জ্বালানি, লক্ষ্য এখন একটাই—ভূরাজনৈতিক সংকট যত বড়ই হোক, অর্থনীতির চাকা যেন থেমে না যায়।
এশিয়ার আরো কয়েকটি দেশ নিজেদের অর্থনীতিকে একইভাবে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করছে।
লাওস নিজেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও লজিস্টিকসের একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে। সংকটের সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যেন এর ওপর নির্ভর করতে পারে, সেটিই দেশটির লক্ষ্য। সিঙ্গাপুরও খাদ্য ও কাঁচামালের ক্ষেত্রে দেশের ভেতরের সক্ষমতা বাড়াতে চাচ্ছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশটি মোট প্রোটিনের ৩০ শতাংশ এবং ফাইবারের ২০ শতাংশ অভ্যন্তরীণভাবে সরবরাহের লক্ষ্য নিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া আবার প্রযুক্তিতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে চাচ্ছে। দেশটি ‘কে-ক্লাউড’ প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। এর মাধ্যমে চিপ থেকে শুরু করে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএম পর্যন্ত নিজস্ব এআই অবকাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এমনকি রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ দেশগুলোও একে অন্যের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে জানিয়েছে, দেশটির সবচেয়ে উন্নত চিপ শুধু নিজস্ব ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। অন্য দেশকে তা দেয়ার সুযোগ সীমিত করা হচ্ছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নতুন শিল্প-কারখানা, অবকাঠামো ও মজুদ গড়ে তুলতে প্রতিযোগিতায় নামছে।
বাণিজ্য ও উৎপাদনের সিদ্ধান্তেও বদল আসছে। আগে কোনো দেশে কারখানা স্থাপন বা পণ্য উৎপাদন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক কিনা তা-ই ছিল প্রধান বিবেচ্য বিষয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে লাভের হিসাবের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে—দেশটি ভূরাজনৈতিকভাবে কতটা নিরাপদ। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মারপ্যাঁচ বিবেচনায় নিয়েই এখন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
আবিশুর প্রকাশের মতে, এশিয়ার সব দেশ যে অর্থনৈতিক দুর্গ তৈরির পথে হাঁটছে, তা নয়। কিছু দেশ বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রবাহ সচল রাখার চেষ্টা করছে।
হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা ও মালাক্কা প্রণালিতে সম্ভাব্য টোল আরোপের পরিস্থিতিতে থাইল্যান্ড ফের থাই খাল প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। এর মাধ্যমে মালাক্কা প্রণালির বিকল্প একটি বাণিজ্যপথ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকক পণ্য ও সেবার প্রবাহকে আটকে দেয়ার পরিবর্তে তা সচল রাখতে চায়।
একসময় ‘দুর্গ অর্থনীতি’র ধারণা মূলত নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা বা বিচ্ছিন্ন দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিল। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। বিশ্বের অনেক দেশই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত। তাই তারা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য একই পথে হাঁটছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতিকে সুরক্ষিত করতে গিয়ে দেশগুলো যদি নিজেদের আরো বেশি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, তাহলে সেই উদ্যোগই বৈশ্বিক বিভাজনকে আরো গভীর করতে পারে। এক দেশের নিরাপত্তার ব্যবস্থা অন্য দেশের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত বিশ্ব এমন একটি অর্থনীতির দিকে যেতে পারে, যেখানে সহযোগিতার বদলে প্রতিযোগিতাই প্রধান হয়ে উঠবে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে