শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, যুগ যুগ ধরে নিপীড়িত ও বঞ্চিত শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শ্রম সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও জনআকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সবার জন্য একটি মর্যাদাকর শ্রমপরিবেশ গড়ে তোলায় সহায়তা করতে শ্রম সংস্কার কমিশন কাজ করবে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর শ্রম ভবনে আয়োজিত শ্রম কমিশনের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানায় শ্রম সংস্কার কমিশন।
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকের জন্য গণতান্ত্রিক শ্রম আইন, শোভন ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, কাজের নিরাপত্তা, জাতীয় ন্যূনতম ও ন্যায্য-মর্যাদাপূর্ণ মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা, সংগঠিত হওয়া ও দরকষাকষির অধিকার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার, অবাধে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার, দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন ও ব্যবসায়ী সংগঠনের চর্চা, শিল্প খাত বিকাশের স্বার্থে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি পর্যালোচনা ও সুপারিশসহ ন্যায্য অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কমিশন প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করবে। যে সুপারিশগুলো সুষ্ঠু শ্রমিক ও শিল্প স্বার্থ এবং শিল্পসম্পর্ক চর্চা, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তীমূলক উন্নয়ন, বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং মর্যাদাকর বাংলাদেশ গড়ে তোলার অভিযাত্রায় অবদান রাখবে।’
বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ যুগ যুগ ধরে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কৃষি খাতে নিয়োজিত আছেন। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন শিল্প খাতেও। “শ্রমিক” হিসেবে শিল্প খাতের শ্রমিকদের আইনগত স্বীকৃতি থাকলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সিংহভাগ শ্রমিকের আইনগত স্বীকৃতিই নেই। আবার দেশে ও বিদেশে কর্মরত আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনেরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলেও অদ্যাবধি তারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মর্যাদা লাভ করতে পারেননি এবং সামাজিকভাবেও তারা মর্যাদাহীন অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো শ্রমিককে ছোট করে দেখা আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ হয়ে গেছে।’
ঘরে ঘরে গৃহশ্রমিক নির্যাতন, প্রতিনিয়ত নির্মাণশ্রমিকদের মৃত্যু, শিপব্রেকিং কিংবা পরিবহন খাতের দুর্ঘটনা শ্রমিকদের প্রতি নীতিনির্ধারক ও সমাজের অবহেলাজনিত দৃষ্টিভঙ্গিকেই ফুটিয়ে তোলে বলে কমিশন প্রধান উল্লেখ করেন।
সমাজের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় অংশ সুইপার বা পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সমাজকাঠামোর বাইরে রেখে অন্তর্ভুক্তীমূলক সমাজ কিংবা বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয় জানিয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সব শ্রমিক এবং দেশের বাইরে কর্মরত সব অভিবাসী শ্রমিক, সবার অধিকার সুরক্ষা ও কল্যাণে ভূমিকা রাখাসহ তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনে এ কমিশন প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে বলে তিনি জানান।
শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রথম সভায় অন্য সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শ্রম কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. মাহফুজুল হক, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটি বাংলাদেশ এবং ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) সভাপতি তপন দত্ত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের অধ্যাপক ও গবেষক ড. জাকির হোসেন, বাংলাদেশ লেবার কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এবং সলিডারিটি সেন্টারের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর অ্যাডভোকেট একেএম নাসিম, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভা প্রধান তাসলিমা আখতার প্রমুখ।