বাংলাদেশের ঋণমান নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীলে উন্নীত করেছে মুডিস

ডিসের সর্বশেষ মূল্যায়নে রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে আসা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাত ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছে সংস্থাটি।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, বিনিময় হার ব্যবস্থায় নমনীয়তা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে আসার কারণে বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস রেটিংস। আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত সর্বশেষ মূল্যায়নে মুডিস বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ইস্যুয়ার ও সিনিয়র আনসিকিউরড রেটিং ‘বি২’ এবং স্বল্পমেয়াদি ইস্যুয়ার রেটিং ‘নট প্রাইম’ অপরিবর্তিত রেখেছে। তবে ‘বি২’ রেটিংয়ের ক্ষেত্রে আগে যে ঝুঁকিগুলো নেতিবাচক পূর্বাভাসের কারণ হয়েছিল, সেগুলো এখন তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ বলে মনে করছে সংস্থাটি।

মুডিস বলেছে, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন, সরকারের শক্তিশালী ম্যান্ডেট এবং সংস্কার কার্যক্রম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ঝুঁকি কমিয়েছে। সংস্থাটির মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, আরো নমনীয় বিনিময় হার ব্যবস্থা এবং রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়ায় উচ্চ জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের চাপও কিছুটা সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছে।

মুডিসের হিসাবে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে প্রায় ৩২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা দিয়ে চার মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। ২০২৪ সালের শেষে রিজার্ভ ছিল প্রায় ২১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। রেকর্ড রেমিট্যান্স, বিনিময় হার ব্যবস্থায় নমনীয়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের আগের বিভিন্ন অসঙ্গতি দূর হওয়াকে রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে মুডিস।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের অব্যাহত যোগাযোগকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংস্থাটি। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বৈদেশিক অর্থায়ন ও অর্থনৈতিক সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে। তবে পরবর্তী আইএমএফ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এখনও চলছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছে মুডিস।

বাংলাদেশের ঋণমান ‘বি২’ পর্যায়ে অপরিবর্তিত রাখার ক্ষেত্রে সীমিত রাজস্বভিত্তি, ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার দুর্বলতা এবং ব্যাংকখাতের উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়েছে সংস্থাটি। তবে ব্যাংক খাতে তারল্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছে তারা। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ব্যাংকখাতে আমানত প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। ফলে তারল্যের চেয়ে খাতের প্রধান দুর্বলতা এখন সচ্ছলতা বা মূলধন সক্ষমতা বলে মনে করছে মুডিস।

সরকারের সীমিত রাজস্বভিত্তিকেও বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতাকেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে তারা। সাম্প্রতিক সময়ে একটি এলএনজি আমদানি টার্মিনালে বিঘ্নের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও সার উৎপাদনে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেওয়ায় দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া আগামী বছরগুলোয় স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং সহজ শর্তের বৈদেশিক অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে মুডিস।

তবে বাংলাদেশের রপ্তানিতে তৈরি পোশাকখাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ধরে রাখবে বলে মনে করছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার কারণে তৈরি পোশাকখাত রপ্তানির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে থাকবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে মুডিস। অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাতের বড় ধরনের দায় সরকারের ওপর বর্তালে, প্রবৃদ্ধি বা রাজস্ব পরিস্থিতির অবনতি, বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ কমে যাওয়া কিংবা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ফিরে এলে বাংলাদেশের ঋণমানের ওপর নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি হতে পাওে বলে জানিয়েছে মুডিস।

সামগ্রিকভাবে মুডিসের সর্বশেষ মূল্যায়নে রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কমে আসা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাত ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছে সংস্থাটি।

আরও